সারাদিন ক্লান্তিহীন থাকতে সেহরিতে যা খাবেন: পুষ্টিবিদের পরামর্শ।
🌅 সেহরিতে সঠিক খাবারই রাখবে আপনাকে সারাদিন সতেজ
রমজানে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে অনেকেই ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতায় ভোগেন। কিন্তু সঠিকভাবে পরিকল্পিত পুষ্টিকর সেহরি আপনার শরীরকে দেবে প্রয়োজনীয় শক্তি এবং রাখবে কর্মক্ষম।
এই পোস্টে জানুন পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী সেহরিতে কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন এবং কীভাবে সহজ খাবার দিয়েই সারাদিন ক্লান্তিহীন থাকা যায়। পুরো লেখাটি পড়ুন এবং গড়ে তুলুন স্বাস্থ্যকর অভ্যাস!
১. সেহরির গুরুত্ব ও উপকারিতা
রমজান মাসে সেহরি শুধুমাত্র একটি খাবার নয়; এটি রোজার প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিক ও পুষ্টিকর সেহরি সারাদিন শরীরকে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে এবং রোজা পালনকে সহজ করে তোলে। অনেকেই ভোরে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হওয়ায় সেহরি এড়িয়ে যান, কিন্তু এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার আগে শরীরকে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও শক্তি দেওয়া জরুরি।
সেহরিতে জটিল শর্করা (কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট), প্রোটিন এবং ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। যেমন—ওটস, লাল চালের ভাত, ডাল, ডিম, দুধ, ফলমূল ইত্যাদি। এসব খাবার ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি সরবরাহ করে। ফলে সারাদিন অতিরিক্ত ক্ষুধা বা দুর্বলতা কম অনুভূত হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শরীরে পানির ঘাটতি ক্লান্তি ও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
সঠিক সেহরি রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে, যা মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। যারা নিয়মিত সেহরি করেন, তারা তুলনামূলকভাবে কম ক্লান্তি অনুভব করেন এবং দৈনন্দিন কাজ স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করতে পারেন। এছাড়া পুষ্টিকর সেহরি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও সহায়তা করে। তাই সুস্থভাবে রোজা পালন করতে চাইলে সেহরিকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।
২. সারাদিন ক্লান্তি কেন হয়
রোজার সময় অনেকেই সারাদিন ক্লান্তি, অবসাদ বা ঝিমুনিভাব অনুভব করেন। এর পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, সেহরি না খাওয়া বা অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা। যদি সেহরিতে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, তেলযুক্ত বা চিনি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া হয়, তাহলে তা দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং শরীর দ্রুত শক্তিহীন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, পানির অভাব একটি বড় কারণ। রোজায় দীর্ঘ সময় পানি না পান করার ফলে ডিহাইড্রেশন হতে পারে, যা মাথাব্যথা, দুর্বলতা ও মনোযোগের ঘাটতি তৈরি করে। তৃতীয়ত, ঘুমের ঘাটতি ক্লান্তির অন্যতম কারণ। অনেকেই তারাবি নামাজ ও রাত জাগার কারণে পর্যাপ্ত ঘুম পান না, ফলে শরীরের স্বাভাবিক শক্তি কমে যায়।
এছাড়া অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণও সমস্যা তৈরি করতে পারে। অনেকেই সেহরিতে বেশি চা বা কফি পান করেন, যা সাময়িকভাবে সতেজতা দিলেও পরে শক্তি কমে যাওয়ার কারণ হয়। একইভাবে অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে আবার দ্রুত কমিয়ে দেয়, ফলে হঠাৎ দুর্বলতা দেখা দেয়।
সারাদিন ক্লান্তি এড়াতে সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি হালকা শারীরিক কার্যক্রম ও ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখলে শরীর ও মন দুটোই সুস্থ থাকে। সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনতার মাধ্যমে রোজার সময়ও কর্মক্ষম ও সতেজ থাকা সম্ভব।
৩. সেহরিতে কী ধরনের খাবার বেছে নেবেন
রমজানে সেহরি এমনভাবে পরিকল্পনা করা উচিত যাতে তা সারাদিন শরীরকে পর্যাপ্ত শক্তি ও পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। সঠিক খাবার নির্বাচন করলে রোজার সময় ক্লান্তি, অতিরিক্ত ক্ষুধা ও দুর্বলতা অনেকটাই কমে যায়। তাই সেহরিতে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রথমত, সেহরিতে জটিল শর্করা বা কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট রাখা উচিত। যেমন—লাল চালের ভাত, আটার রুটি, ওটস বা চিড়া। এসব খাবার ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি সরবরাহ করে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে এবং হঠাৎ শক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
দ্বিতীয়ত, ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার যেমন শাকসবজি, ফলমূল ও ডাল অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ফাইবার হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি দেয়। এতে অযথা ক্ষুধা লাগে না এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে।
তৃতীয়ত, সেহরিতে অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। এসব খাবার হজমে সময় নেয় এবং এসিডিটি বা অস্বস্তির কারণ হতে পারে। একইভাবে অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়িয়ে আবার দ্রুত কমিয়ে দেয়, যা দুর্বলতা সৃষ্টি করে।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। সেহরিতে অন্তত ২–৩ গ্লাস পানি পান করলে শরীরের পানিশূন্যতা কমে এবং সারাদিন সতেজ থাকা সহজ হয়। সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিলে রোজা পালন আরও সহজ ও আরামদায়ক হয়।
৪. প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের ভূমিকা
সেহরিতে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রোটিন শরীরের কোষ গঠন, পেশি রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘস্থায়ী শক্তি প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রোটিন ধীরে হজম হয়, ফলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা অনুভূত হয় না।
ডিম, দুধ, দই, ডাল, ছোলা, মুরগির মাংস বা মাছ প্রোটিনের ভালো উৎস। সেহরিতে একটি সেদ্ধ ডিম বা এক বাটি ডাল যোগ করলে তা শরীরকে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করে। এতে শরীরের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সারাদিনের ক্লান্তি কম অনুভূত হয়।
প্রোটিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, যা রোজার সময় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। অনেক সময় শুধু কার্বোহাইড্রেটভিত্তিক খাবার খেলে দ্রুত ক্ষুধা লাগে, কিন্তু প্রোটিন যুক্ত করলে সেই সমস্যা কমে যায়।
এছাড়া প্রোটিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, কিন্তু পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করলে শরীর সুস্থ ও সক্রিয় থাকে।
সুতরাং, সেহরিতে কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার ও প্রোটিনের সঠিক সমন্বয় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করলে রোজার সময় শক্তি, সহনশীলতা ও মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। সুস্থ ও কার্যকর রোজা পালনের জন্য পুষ্টিকর সেহরি পরিকল্পনা করা সবার জন্যই প্রয়োজন।
৫. জটিল কার্বোহাইড্রেট কেন প্রয়োজন
রমজানে সেহরির খাবার নির্বাচন করার সময় জটিল কার্বোহাইড্রেট বা কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার আগে শরীরকে এমন খাবার দিতে হবে যা ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে। জটিল কার্বোহাইড্রেট ঠিক সেই কাজটিই করে থাকে। লাল চাল, আটার রুটি, ওটস, ব্রাউন ব্রেড, চিড়া ও বিভিন্ন ধরনের ডাল—এসব খাবারে জটিল কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে।
সহজ কার্বোহাইড্রেট যেমন সাদা পাউরুটি, অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টিজাত খাবার দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে আবার দ্রুত কমিয়ে দেয়। ফলে কিছু সময় পরই ক্লান্তি, দুর্বলতা ও ক্ষুধা অনুভূত হয়। কিন্তু জটিল কার্বোহাইড্রেট দীর্ঘস্থায়ী শক্তি প্রদান করে, যা রোজার সময় কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
এছাড়া জটিল কার্বোহাইড্রেট শরীরের বিপাকক্রিয়া সঠিক রাখতে সাহায্য করে। এটি ধীরে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়, ফলে সারাদিন মস্তিষ্ক ও পেশি পর্যাপ্ত শক্তি পায়। যারা সেহরিতে সঠিক পরিমাণে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করেন, তারা তুলনামূলকভাবে কম ক্লান্তি অনুভব করেন এবং মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন।
সেহরিতে ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবারের পরিবর্তে জটিল কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া স্বাস্থ্যসম্মত সিদ্ধান্ত। এটি শুধু শক্তি জোগায় না, বরং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। তাই সুস্থ ও সক্রিয় রোজা পালনের জন্য জটিল কার্বোহাইড্রেট অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
৬. ফাইবার ও ফলমূলের গুরুত্ব
সেহরির খাবারে ফাইবার ও ফলমূল অন্তর্ভুক্ত করা রোজার সময় সুস্থ থাকার অন্যতম চাবিকাঠি। ফাইবার হজম প্রক্রিয়া ধীর করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি বজায় রাখে। এতে অপ্রয়োজনীয় ক্ষুধা কমে এবং সারাদিন শক্তি ধরে রাখা সহজ হয়। শাকসবজি, ডাল, ওটস, লাল চাল ও বিভিন্ন ফলমূল ফাইবারের ভালো উৎস।
ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা রোজার সময় অনেকেরই সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ করলে অন্ত্রের কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকে এবং হজমের সমস্যা কমে। এছাড়া ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, যা শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ফলমূল শরীরকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে। কলা, আপেল, খেজুর, কমলা বা পেঁপে সেহরিতে যোগ করলে শরীর সতেজ থাকে এবং পানির ঘাটতি কিছুটা পূরণ হয়। বিশেষ করে পানিসমৃদ্ধ ফল যেমন তরমুজ বা কমলা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে।
ফাইবার ও ফলমূল একসঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্লান্তি কমাতে সহায়তা করে। সুষম খাদ্যতালিকায় এগুলো অন্তর্ভুক্ত করলে রোজার সময় দুর্বলতা কম অনুভূত হয় এবং সারাদিন কর্মক্ষম থাকা সম্ভব হয়। তাই স্বাস্থ্যকর সেহরির জন্য ফাইবার ও ফলমূল অপরিহার্য উপাদান।
৭. পর্যাপ্ত পানি পানের সঠিক নিয়ম
রমজানে দীর্ঘ সময় না খেয়ে ও না পান করে থাকার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সেহরি ও ইফতারের মধ্যবর্তী সময়ে পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই সেহরির সময় একসঙ্গে বেশি পানি পান করেন, যা সবসময় কার্যকর নয়। সঠিক নিয়ম হলো ধীরে ধীরে এবং নির্দিষ্ট ব্যবধানে পানি পান করা।
সেহরিতে অন্তত ২–৩ গ্লাস পানি পান করা উচিত, তবে একবারে অতিরিক্ত পানি পান না করে ধীরে ধীরে পান করাই ভালো। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়কে ভাগ করে ৭–৮ গ্লাস পানি পান করার অভ্যাস করলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে। এতে মাথাব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শুষ্কতার সমস্যা কমে যায়।
পানির পাশাপাশি প্রাকৃতিক তরল যেমন লেবুর শরবত, ডাবের পানি বা ফলের জুস (চিনি ছাড়া) গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি মিশ্রিত শরবত বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কম খাওয়াই উত্তম, কারণ এগুলো শরীর থেকে পানি বের করে দিতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখা এবং শক্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে। যারা নিয়ম মেনে পানি পান করেন, তারা সাধারণত কম দুর্বলতা অনুভব করেন এবং সারাদিন সতেজ থাকতে পারেন। তাই স্বাস্থ্যকর রোজা পালনের জন্য সঠিক নিয়মে পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি।
৮. যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
সেহরিতে সঠিক খাবার নির্বাচন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কিছু খাবার এড়িয়ে চলাও সমান প্রয়োজনীয়। অতিরিক্ত তেলযুক্ত, ভাজাপোড়া ও ঝাল খাবার রোজার সময় অস্বস্তির কারণ হতে পারে। এসব খাবার হজমে সময় নেয় এবং গ্যাস্ট্রিক, অম্বল বা পেটের অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে।
অতিরিক্ত মিষ্টিজাত খাবার ও চিনি সমৃদ্ধ পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত। এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয় এবং কিছু সময় পর তা দ্রুত কমে যায়, ফলে দুর্বলতা ও ক্লান্তি দেখা দেয়। একইভাবে অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার শরীরে পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে, কারণ লবণ তৃষ্ণা বৃদ্ধি করে।
ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় যেমন অতিরিক্ত চা বা কফি সেহরিতে কম খাওয়াই ভালো। ক্যাফেইন শরীর থেকে পানি বের করে দিতে পারে এবং দীর্ঘ সময় তৃষ্ণা অনুভূত হতে পারে। ফলে সারাদিন অস্বস্তি ও মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্টফুডজাত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। এগুলোতে সাধারণত অতিরিক্ত চর্বি, লবণ ও সংরক্ষণকারী উপাদান থাকে, যা শরীরের জন্য উপকারী নয়। স্বাস্থ্যকর ও সুষম সেহরির জন্য প্রাকৃতিক, পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার বেছে নেওয়াই উত্তম।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে রোজার সময় ক্লান্তি কম হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে। তাই সেহরিতে কী খাবেন এবং কী এড়িয়ে চলবেন—এই বিষয়ে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
৯. পুষ্টিবিদের বিশেষ পরামর্শ
রমজানে সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকতে পুষ্টিবিদদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ অনুসরণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে শরীরের পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেহরি ও ইফতারের খাবার এমনভাবে পরিকল্পনা করা উচিত যাতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও খনিজের সঠিক সমন্বয় থাকে।
পুষ্টিবিদরা বলেন, সেহরিতে জটিল কার্বোহাইড্রেট যেমন লাল চাল, আটার রুটি বা ওটস রাখা ভালো। এর সঙ্গে একটি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার—যেমন ডিম, ডাল বা দই—যোগ করলে দীর্ঘ সময় শক্তি বজায় থাকে। পাশাপাশি ফাইবারসমৃদ্ধ শাকসবজি ও ফলমূল অন্তর্ভুক্ত করলে হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি কমে।
তারা আরও পরামর্শ দেন, ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। একসঙ্গে অতিরিক্ত পানি না খেয়ে ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট ব্যবধানে পানি পান করলে শরীর ভালোভাবে হাইড্রেটেড থাকে। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, কারণ এসব খাবার ক্লান্তি ও হজমজনিত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত। ব্যক্তিভেদে পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন হতে পারে, তাই নিজের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে সুষম খাদ্য নির্বাচন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
১০. প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
প্রশ্ন ১: সেহরিতে কী খেলে সারাদিন কম ক্ষুধা লাগবে?
উত্তর: জটিল কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার একসঙ্গে গ্রহণ করলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে। যেমন—আটার রুটি, ডিম ও শাকসবজি একটি ভালো সমন্বয় হতে পারে।
প্রশ্ন ২: সেহরিতে কত গ্লাস পানি পান করা উচিত?
উত্তর: সেহরিতে অন্তত ২–৩ গ্লাস পানি পান করা ভালো। তবে ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত মোট ৭–৮ গ্লাস পানি পান করলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে।
প্রশ্ন ৩: সেহরিতে চা বা কফি খাওয়া যাবে কি?
উত্তর: অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে, তবে অতিরিক্ত ক্যাফেইন তৃষ্ণা বাড়াতে পারে। তাই সীমিত রাখা উত্তম।
প্রশ্ন ৪: ভাজাপোড়া খাবার কেন এড়িয়ে চলা উচিত?
উত্তর: ভাজাপোড়া ও তেলযুক্ত খাবার হজমে সময় নেয় এবং অম্বল বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা তৈরি করতে পারে। এতে রোজার সময় অস্বস্তি বাড়তে পারে।
প্রশ্ন ৫: ফলমূল কি সেহরিতে প্রয়োজন?
উত্তর: অবশ্যই। ফলমূল শরীরকে ভিটামিন, খনিজ ও প্রাকৃতিক পানি সরবরাহ করে, যা ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে।
১১. উপসংহার
রমজানে সুস্থ ও শক্তিশালী থাকতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেহরি এমনভাবে পরিকল্পনা করা উচিত যাতে তা সারাদিনের প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি জোগাতে সক্ষম হয়। জটিল কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফাইবার ও পর্যাপ্ত পানি—এই চারটি উপাদান সুষম সেহরির মূল ভিত্তি।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত তেল-চর্বি, মিষ্টিজাত খাবার ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এড়িয়ে চললে শরীর হালকা ও স্বস্তিতে থাকে। পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যতালিকা সাজালে রোজা পালন আরও সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মত হয়।
সচেতন খাদ্যাভ্যাস শুধু রমজানেই নয়, সারা বছর সুস্থ থাকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং নিয়মিত পানি পান করুন। সঠিক পরিকল্পনায় সেহরি গ্রহণ করলে সারাদিন কর্মক্ষম, সতেজ ও প্রাণবন্ত থাকা সম্ভব।

.png)
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url