আধুনিক সেচ ব্যবস্থা: কম পানিতে ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচের উপকারিতা।
💧 জমিতে প্রচুর পানি ঢালছেন, তবু ফসল ভালো হচ্ছে না? সমস্যাটা পানির পরিমাণে নয়, দেওয়ার পদ্ধতিতে হতে পারে!
সেচের খরচ বাড়ছে, ভূগর্ভের পানির স্তর নামছে, অথচ সনাতন পদ্ধতিতে অনেক পানি অপচয় হয়ে যায়। এখন গাছের গোড়ায় ফোঁটা ফোঁটা করে পানি পৌঁছে দেওয়ার আধুনিক পদ্ধতি অনেক কৃষকের কাছে নতুন আশার নাম হয়ে উঠছে।
এই পোস্টে সহজ ভাষায় জানতে পারবেন ড্রিপ ইরিগেশন কী, কীভাবে কাজ করে, কোন ফসলে বেশি উপকারী, কী কী উপকরণ লাগে এবং শুরুর আগে কোন সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রাখবেন। তাই কম পানিতে ভালো ফলনের পথ জানতে পুরো পোস্টটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন। 👇
🌱 আধুনিক সেচ ব্যবস্থা কী ও কেন প্রয়োজন?
কৃষি খাতের আধুনিকায়নে এবং সীমিত পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক সেচ ব্যবস্থা একটি বিপ্লব ঘটিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে জমিতে যেভাবে পানি সেচ করা হয়, তাতে পানির অপচয় হয় প্রচুর পরিমাণে এবং গাছও তার ঠিকঠাক পুষ্টি পায় না। আধুনিক সেচ ব্যবস্থা বলতে এমন এক প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি সরাসরি উদ্ভিদের শিকড় অঞ্চলে বা প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মাপে সরবরাহ করা হয়। এর ফলে পানির অপচয় রোধ হয় এবং ফসলের উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সনাতন পদ্ধতিতে জমি প্লাবিত করে সেচ দিলে অর্ধেকের বেশি পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায় কিংবা মাটির গভীরে চলে যায় যা গাছ কোনোভাবেই ব্যবহার করতে পারে না। অন্যদিকে, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে পানির সাশ্রয় হয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া কৃষকদের কায়িক পরিশ্রম ও সময় অনেকাংশে কমে যায়, যা কৃষিকে আরও লাভজনক ও টেকসই করে তোলে।
💧 ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচ কী?
ড্রিপ ইরিগেশন (Drip Irrigation) বা বিন্দু সেচ হলো আধুনিক মাইক্রো-ইরিগেশন ব্যবস্থার অন্যতম একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে খুব ধীর গতিতে, ফোঁটায় ফোঁটায় সরাসরি গাছের গোড়ায় বা শিকড় অঞ্চলে পানি ও পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা হয়। নাম শুনেই বোঝা যায়, 'বিন্দু বিন্দু' বা ফোঁটা ফোঁটা আকারে পানি পড়ার এই কৌশল উদ্ভিদের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। এটি শুধু যে ছাদবাগান বা ছোট আকারের বাগানের জন্য উপযোগী তা নয়, বরং বাণিজ্যিক কৃষি খামার ও সারিভিত্তিক ফসল চাষেও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিন্দু সেচের মূল লক্ষ্য হলো গাছের চারপাশের মাটিতে সর্বদা একটি আদর্শ আর্দ্রতা বজায় রাখা, যাতে গাছ অতিরিক্ত পানি বা পানির অভাবে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সাধারণ সেচ পদ্ধতির তুলনায় এই পদ্ধতিতে গাছের শিকড় এলাকায় প্রয়োজনমাফিক সুনির্দিষ্ট আর্দ্রতা বজায় থাকে। এর ফলে গাছের বৃদ্ধি অত্যন্ত সুষম হয় এবং কৃষিক্ষেত্রে পানির অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
⚙️ ড্রিপ ইরিগেশন কীভাবে কাজ করে?
ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেমের কার্যপ্রণালী অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুশৃঙ্খল। এই ব্যবস্থায় একটি প্রধান পানির উৎস (যেমন পাম্প, ওভারহেড ট্যাংক বা নলকূপ) থেকে মেইন পাইপ বা মূল লাইনের মাধ্যমে জমিতে পানি সরবরাহ করা হয়। মূল লাইন থেকে পানি পরবর্তীতে সাব-মেইন এবং লেটারাল পাইপের মাধ্যমে গাছের সারি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পাইপগুলোতে নির্দিষ্ট দূরত্বে ড্রিপার বা ইমিটার সংযুক্ত থাকে, যেগুলোর মাধ্যমে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি নির্দিষ্ট পরিমাণে বের হতে থাকে।
পানির এই প্রবাহকে আরও নিখুঁত ও স্বয়ংক্রিয় করতে সিস্টেমের সাথে ফিল্টার, প্রেশার নিয়ন্ত্রক এবং অনেক সময় ডিজিটাল টাইমার বা আইওটি ডিভাইস যুক্ত করা হয়। টাইমার সেট করে দিলে নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেচ কার্যক্রম শুরু হয় এবং সময় শেষ হলে তা বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই সেচ পানির সাথে প্রয়োজনীয় তরল সার সরাসরি গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করা সম্ভব, যাকে ফার্টিগেশন বলা হয়।
🌟 ড্রিপ ইরিগেশনের প্রধান উপকারিতা
কৃষি ক্ষেত্রে ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি প্রবর্তনের ফলে কৃষকরা বহুমুখী সুবিধা ভোগ করছেন। নিচে এর প্রধান উপকারিতাগুলো আলোচনা করা হলো:
১. পানির সর্বোচ্চ সাশ্রয়: ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির তুলনায় এই সিস্টেমে প্রায় ৩০% থেকে ৫০% বা তার বেশি পানি সাশ্রয় হয়, কারণ পানি সরাসরি শিকড়ে পড়ে এবং বাষ্পীভূত হতে পারে না।
২. আগাছা নিয়ন্ত্রণ: গাছের গোড়ার চারপাশে সুনির্দিষ্টভাবে পানি সরবরাহ করায় পুরো জমি ভেজে না, ফলে অপ্রয়োজনীয় ঘাস ও আগাছার উপদ্রব বহুগুণ কমে যায়।
৩. শ্রম ও সময় সাশ্রয়: একবার ড্রিপ সিস্টেম সেটআপ বা ইনস্টল করার পর বারবার জমিতে গিয়ে পাইপ বা বালতি দিয়ে পানি দিতে হয় না, ফলে শারীরিক পরিশ্রম ও সময় দুটোই বাঁচে।
৪. উন্নত ফলন ও গুণগত মান: গাছের পুষ্টি ও পানির সমতা বজায় থাকায় ফসলের বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং ফলের মান ও পরিমাণ উভয়ই বৃদ্ধি পায়।
⚖️ ড্রিপ সেচ ও সনাতন সেচের তুলনা
সনাতন বা ঐতিহ্যবাহী সেচ পদ্ধতি বলতে সাধারণত জমি প্লাবিত করা বা হোস পাইপ দিয়ে যত্রতত্র পানি ছিটানোকে বোঝায়। সনাতন পদ্ধতিতে পানির অপচয় হয় সবচেয়ে বেশি এবং মাটির উপরিভাগের পুষ্টি উপাদান ধুয়ে নিচে চলে যায়। অন্যদিকে, ড্রিপ ইরিগেশন প্রযুক্তিতে সুনির্দিষ্ট মাপে ও নিয়ন্ত্রণে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি সরবরাহ করা হয়, যা মাটির গঠন ও উর্বরতা শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখে।
তুলনামূলক বিচারে সনাতন পদ্ধতিতে কৃষকের কায়িক শ্রম ও পাম্প চালানোর বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খরচ অনেক বেশি হয়। পক্ষান্তরে, ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেমে প্রাথমিক কিছু বিনিয়োগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অত্যন্ত সাশ্রয়ী প্রমাণিত হয়। সনাতন সেচে উঁচু-নিচু জমিতে সমানভাবে পানি পৌঁছানো কঠিন হলেও ড্রিপ সেচ যেকোনো ঢালু বা অসম ভূমিতে সমানভাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
🌾 কোন কোন ফসলে ড্রিপ সেচ উপযোগী?
সকল ধরনের ফসলের জন্য ড্রিপ ইরিগেশন একইভাবে ব্যবহার উপযোগী না হলেও সারিভিত্তিক ফসল এবং উদ্যান কৃষিতে এটি অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে। বিশেষ করে ফল বাগান যেমন আম, পেয়ারা, লেবু, লিচু, নারকেল এবং ড্রাগন ফলের চাষে এই পদ্ধতি অত্যন্ত লাভজনক। এছাড়া সবজি ক্ষেত যেমন টমেটো, বেগুন, মরিচ, শসা, এবং তরমুজ চাষের জন্য এটি আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাণিজ্যিক গ্রীনহাউস, পলিহাউস এবং ছাদবাগানের টব বা বেডের গাছেও বিন্দু সেচ বা ড্রিপ টেপ সিস্টেম ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেসব অঞ্চলে পানির তীব্র সংকট রয়েছে কিংবা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেশি, সেসকল এলাকার শস্য ও পশুখাদ্যের মাঠেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
🛠️ প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রাংশ
একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেম সেটআপ করার জন্য বেশ কিছু নির্দিষ্ট যন্ত্রাংশ ও উপকরণের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক উপাদানগুলো হলো পানির উৎস বা পাম্প, পানির ফিল্টার (যা পাইপ বা ড্রিপার ব্লক হওয়া থেকে রক্ষা করে), প্রেশার রেগুলেটর এবং মেইন বা সাব-মেইন পিভিসি কিংবা এইচডিপিই পাইপ।
এছাড়া সরাসরি গাছের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর জন্য লেটারাল পাইপ, ইন-লাইন ড্রিপ টেপ এবং বিভিন্ন ধরণের ড্রিপার বা ইমিটার ব্যবহৃত হয়। সিস্টেমটিকে আরও আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় করতে ডিজিটাল টাইমার, সোলেনয়েড ভালভ এবং আইওটি সেন্সর সংযোজন করা যেতে পারে, যা কৃষিকাজকে সম্পূর্ণ ঝামেলামুক্ত ও আধুনিক করে তোলে।
📝 ড্রিপ সেচ স্থাপনের ধাপে ধাপে নিয়ম
খামারে বা বাগানে ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচ পদ্ধতি সফলভাবে স্থাপন করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কাঠامোগত পদক্ষেপ অনুসরণ করা আবশ্যক। প্রথম ধাপে জমির পরিমাপ এবং ফসলের বিন্যাস বা গাছের দূরত্ব নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোন ফসলে কী পরিমাণ পানির প্রয়োজন, তার ওপর ভিত্তি করে মেইন পাইপ এবং সাব-মেইন পাইপের ব্যাস নির্ধারণ করা হয়। পানির উৎস থেকে শুরু করে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পাইপলাইন কিভাবে বিস্তৃত হবে, তার একটি সম্পূর্ণ ব্লুপ্রিন্ট বা নকশা কাগজে কলমে বা ডিজিটাল মাধ্যমে তৈরি করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
দ্বিতীয় ধাপে মূল পানির উৎস বা পাম্পের সাথে ওয়াটার ফিল্টার এবং প্রেশার রেগুলেটর সংযোজন করতে হবে, যাতে পানিতে থাকা ময়লা বা বালি পাইপ বা ড্রিপার ব্লক করতে না পারে। এরপর প্রধান লাইন থেকে সাব-মেইন পাইপগুলো জমির বিভিন্ন ব্লকে ছড়িয়ে দিতে হয় এবং টি-জয়েন্ট বা এলবো কাপলিং দিয়ে সংযোগগুলো শক্ত করতে হবে। তৃতীয় বা চূড়ান্ত ধাপে নির্ধারিত দূরত্বে লেটারাল পাইপ বিছিয়ে তাতে নির্দিষ্ট মাপের ড্রিপার বা ইমিটার যুক্ত করতে হয়। পুরো সিস্টেম ইনস্টল করার পর অন্তত একবার পানি চালিয়ে পরীক্ষা বা লিকেজ টেস্ট করে নেওয়া উচিত যে প্রতিটি ড্রিপার থেকে সমানভাবে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ছে কি না।
💰 খরচ ও লাভের হিসাব
কৃষিকাজে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগ বা খরচের বিষয়টি প্রতিটি কৃষকের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিবেচনা। ড্রিপ সেচ সিস্টেম স্থাপনের ক্ষেত্রে জমির আয়তন, ফসলের ধরণ এবং উপকールの মানের ওপর ভিত্তি করে খরচ কমবেশি হতে পারে। ছোট আকারের ছাদবাগান বা পলিহাউসের জন্য খরচ কম হলেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কয়েক বিঘা জমিতে পাইপ, ফিল্টার, পাম্প এবং ড্রিপার সেট করতে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা বড় অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়। তবে একবার এই অবকাঠামো তৈরি হয়ে গেলে তা দীর্ঘ কয়েক বছর অবলীলায় সেবা দিয়ে যায়।
দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক মূল্যায়নে ড্রিপ সেচ পদ্ধতি অত্যন্ত লাভজনক ও সাশ্রয়ী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সনাতন পদ্ধতিতে সেচ দিতে গিয়ে প্রতিবার যে জ্বালানি খরচ, বিদ্যুৎ বিল বা অতিরিক্ত শ্রমিকের মজুরি দিতে হয়, ড্রিপ সেচে তা প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে। অন্যদিকে পানির সাশ্রয় এবং সুষম সার প্রয়োগের ফলে ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধি পায়, যা বাজারে কৃষণকে ভালো দাম পেতে সাহায্য করে। হিসাব অনুযায়ী, প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থ সাধারণত এক থেকে দেড় মৌসুমের অতিরিক্ত ফসল বিক্রি করেই তুলে নেওয়া সম্ভব হয়।
🧰 যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের নিয়ম
ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেমের দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হলো ক্ষুদ্র ড্রিপারগুলোতে ময়লা, অ্যালগি বা খনিজ লবণের আস্তরণ জমে মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এটি রোধ করার জন্য নিয়মিত বিরতিতে ওয়াটার ফিল্টার পরিষ্কার করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর হালকা অ্যাসিডিক ওয়াশ বা ফ্লাশিংয়ের মাধ্যমে পাইপলাইনের ভেতরের জমানো ময়ুলা ও অবশেষ পরিষ্কার করতে হবে।
এছাড়াও মৌসুম শেষে বা ফসল তোলার অন্তিম পর্যায়ে লেটারাল পাইপগুলোর শেষ প্রান্তের ক্লিপ বা ক্যাপ খুলে পানি বের করে পরিষ্কার করে রাখা ভালো, যাতে ভেতরে কোনো শেওলা জমতে না পারে। ইঁদুর বা অন্য কোনো তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণী যাতে পাইপ কেটে নষ্ট করতে না পারে, সেজন্য পাইপগুলোর অবস্থান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো স্থানে লিকেজ বা ছিদ্র দেখা দিলে দেরি না করে তাৎক্ষণিকভাবে তা মেরামত বা রিং কানেক্টর দিয়ে ঠিক করে নিতে হবে।
⚠️ সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য সমস্যা
অফুরন্ত সুবিধার পাশাপাশি ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেমের কিছু নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে যা কৃষকদের জেনে রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো প্রাথমিক সেটআপ খরচ, যা অনেক প্রান্তিক কৃষকের জন্য এককভাবে বহন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া সিস্টেমের নিখুঁত পরিচালনার জন্য কারিগরি জ্ঞান ও রক্ষণাবেক্ষণের ধারণা থাকা আবশ্যক, যা সাধারণ কৃষকদের অনেকের জন্যই নতুন এবং কিছুটা জটিল মনে হতে পারে।
পানির উৎসে যদি অতিরিক্ত পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম বা খনিজ লবণ থাকে, তবে ড্রিপার খুব দ্রুত ব্লক হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এর ফলে খামারের বিভিন্ন অংশে অসম পানি সরবরাহ হতে পারে যা গাছের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটায়। তাছাড়া ভুল ডিজাইনের কারণে জমির শেষ প্রান্তে পানির প্রেশার কমে যেতে পারে, যা নিয়মিত মনিটরিং ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাধান করা না হলে ফসলের ক্ষতিসাধন করতে পারে।
🤝 সরকারি সহায়তা ও পরামর্শ পাওয়ার উপায়
আধুনিক কৃষির বিস্তার এবং পানির অপচয় রোধে বর্তমান সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন অধিদপ্তর থেকে আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বিএডিসি (BADC)-এর মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে আধুনিক সেচ যন্ত্রপাতি ভর্তুকি মূল্যে প্রদান কিংবা বিশেষ প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে। এসব সহায়তা পাওয়ার জন্য স্থানীয় উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে নিবন্ধিত হতে পারেন।
সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাইভেটে অনুমোদিত ইরিগেশন কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকেও বিনা মূল্যে কারিগরি পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ সেশনের ব্যবস্থা করা হয়। আপনার এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে বিভিন্ন প্রণোদনা ও সরকারি প্রকল্পের সঠিক সময়োপযোগী তথ্য সহজেই পেয়ে যাবেন। এছাড়া দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের পরামর্শ নিয়ে খামারে সঠিক নকশার ড্রিপ সিস্টেম স্থাপন করলে সরকারি সুবিধার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
❓ সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেমে কি ঘোলা বা আয়রনযুক্ত পানি ব্যবহার করা যাবে?
উত্তর: ফিল্টার ছাড়া সরাসরি আয়রন বা পলিযুক্ত পানি ব্যবহার করলে ড্রিপার খুব দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। তাই এই সিস্টেমে পানি ব্যবহারের আগে অবশ্যই ভালো মানের স্যান্ড ফিল্টার বা ডিস্ক ফিল্টার ব্যবহার করতে হবে।
প্রশ্ন ২: ধান বা গমের মতো ঘন ফসলে কি ড্রিপ সেচ দেওয়া সম্ভব?
উত্তর: সাধারণত ধান বা গমের মতো অধিক ঘন ও প্লাবিত জমির ফসলের চেয়ে সারিভিত্তিক সবজি, ফলবাগান এবং উদ্যান ফসলের জন্যই ড্রিপ ইরিগেশন সবচেয়ে বেশি উপযোগী ও কার্যকর।
প্রশ্ন ৩: একটি ড্রিপ সেচ সিস্টেম সাধারণত কত বছর স্থায়ী হয়?
উত্তর: নিয়মিত যত্ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভালো মানের পিভিসি বা এলডিপিই পাইপ ব্যবহার করলে একটি ড্রিপ সিস্টেম সহজেই ৮ থেকে ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে সচল থাকে।


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url