কেন ধনীরা সব সময় আরও ধনী হতে থাকে? সিস্টেমের ভেতরের খেলা।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন—কেন ধনীরা সময়ের সাথে সাথে আরও ধনী হয়ে ওঠে, আর সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সাফল্য যেন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে? এটি কি কেবল পরিশ্রম ও মেধার ফল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এমন কিছু নিয়ম ও সুবিধা যা সিস্টেমের ভেতর থেকেই ধনীদের পক্ষে কাজ করে? বিনিয়োগ, করনীতি, সম্পদ বণ্টন ও আর্থিক জ্ঞান—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য খেলা, যা বুঝতে পারলেই পরিষ্কার হয় কেন অর্থের প্রবাহ সব সময় একই দিকেই যায়।
ভূমিকা: ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান কেন বাড়ছে?
বর্তমান বিশ্বে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিকে অল্প কিছু মানুষ বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠছে, অন্যদিকে বিপুল জনগোষ্ঠী ন্যূনতম জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতেই হিমশিম খাচ্ছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, বরং সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার উপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।
ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হলো সম্পদের অসম বণ্টন। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মূলধন, প্রযুক্তি ও সুযোগের অধিকাংশই ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে তারা আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ পায় এবং দরিদ্র শ্রেণি সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
আরো পড়ুন: কেন ধনীরা সবসময় আরো ধনী হতে থাকে? সিস্টেমের ভেতর খেলা ।
শিক্ষা ও দক্ষতার বৈষম্যও এই ব্যবধান বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। ধনী পরিবারগুলো উন্নত শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়, যা তাদের ভবিষ্যৎ আয় আরও বাড়িয়ে তোলে। বিপরীতে দরিদ্র পরিবারগুলো মৌলিক শিক্ষা থেকেও অনেক সময় বঞ্চিত হয়, ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ থাকে।
এছাড়া অর্থনৈতিক নীতিমালা ও করব্যবস্থাও ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অনেক দেশে করব্যবস্থা ধনীদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ, যেখানে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের উপর কর ও মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি পড়ে। ফলে ধনীরা সম্পদ জমাতে পারে, আর দরিদ্ররা প্রতিদিনের খরচ মেটাতেই সংগ্রাম করে।
ধনীরা আরও ধনী হয় কেন? মূল ধারণা
ধনীরা আরও ধনী হয় মূলত “টাকা দিয়ে টাকা বানানো” নীতির কারণে। যাদের হাতে মূলধন আছে, তারা সেই অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে অতিরিক্ত আয় সৃষ্টি করতে পারে। শেয়ার বাজার, রিয়েল এস্টেট, ব্যবসা কিংবা ডিজিটাল সম্পদ—সব ক্ষেত্রেই মূলধন থাকলে আয়ের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
ধনীদের কাছে তথ্য ও সুযোগ দ্রুত পৌঁছায়। নতুন ব্যবসার ধারণা, লাভজনক বিনিয়োগ কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা তারা সবার আগে পায়। এই তথ্যগত সুবিধা (Information Advantage) তাদের সিদ্ধান্তকে আরও কার্যকর করে তোলে এবং ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ধনীদের আর্থিক শৃঙ্খলা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অধিকাংশ ধনী ব্যক্তি তাৎক্ষণিক ভোগের চেয়ে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়। তারা আয়ের একটি বড় অংশ পুনরায় বিনিয়োগ করে, ফলে চক্রবৃদ্ধি সুদের মতো সম্পদ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
ধনীরা সাধারণত সিস্টেমের সুবিধা নিতে জানে। ব্যাংক ঋণ, কর ছাড়, ব্যবসায়িক প্রণোদনা ও আইনি সুবিধা তাদের জন্য সহজলভ্য। এই ব্যবস্থাগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করে তারা ঝুঁকি কমিয়ে আরও বেশি সম্পদ অর্জন করে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে করা কঠিন।
সবশেষে বলা যায়, ধনী হওয়া শুধু ভাগ্যের ব্যাপার নয়; এটি মূলত সুযোগ, জ্ঞান, সিস্টেম ও সিদ্ধান্তের সমন্বয়। যে সমাজে এই সুযোগগুলো সমানভাবে বণ্টিত নয়, সেখানে ধনী আরও ধনী হয় এবং দরিদ্র আরও পিছিয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা বুঝে অর্থনৈতিক সচেতনতা ও ন্যায্য নীতিমালা গড়ে তোলাই পারে এই ব্যবধান কমাতে।
সিস্টেম কীভাবে ধনীদের পক্ষে কাজ করে
আধুনিক সমাজব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সিস্টেম এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে এটি স্বাভাবিকভাবেই ধনীদের পক্ষে বেশি কাজ করে। এখানে “সিস্টেম” বলতে বোঝানো হচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, করনীতি, বিনিয়োগ কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাজারের নিয়মকানুন—যেগুলো মিলেই একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে। এই পরিবেশে যার কাছে আগে থেকেই পুঁজি আছে, সে তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে বেশি লাভের সুযোগ পায়।
ব্যাংকিং ব্যবস্থাই এর একটি বড় উদাহরণ। ধনীরা সহজেই বড় অঙ্কের ঋণ কম সুদে পেয়ে যায়, কারণ তাদের জামানত ও ক্রেডিট হিস্ট্রি শক্তিশালী। এই ঋণ তারা ব্যবসা বা বিনিয়োগে ব্যবহার করে আরও বেশি আয় তৈরি করে। অথচ দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত মানুষ একই সুযোগ পায় না, পেলেও সুদের হার অনেক বেশি হয়।
করব্যবস্থাও ধনীদের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। অনেক দেশে বিনিয়োগ, শেয়ার বাজার বা সম্পদ বিক্রির উপর কর কম, অথচ সাধারণ মানুষের আয়ের উপর করের চাপ বেশি। ফলে ধনীরা আইনি উপায়ে কর কমিয়ে সম্পদ জমাতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষ মাসিক আয় থেকেই বেশি কর দিতে বাধ্য হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্য ও নেটওয়ার্ক। ধনীরা সাধারণত শক্তিশালী সামাজিক ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের অংশ হয়। তারা আগেভাগেই নতুন বিনিয়োগের সুযোগ, বাজারের পরিবর্তন বা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে পারে। এই তথ্যগত সুবিধা তাদের সিদ্ধান্তকে আরও লাভজনক করে তোলে।
শিক্ষা ব্যবস্থাও এই সিস্টেমের অংশ। ধনী পরিবারগুলো উন্নত শিক্ষা, বিদেশি ডিগ্রি ও স্কিল ডেভেলপমেন্টে বিনিয়োগ করতে পারে। এর ফলে তাদের সন্তানেরা ভবিষ্যতে উচ্চ আয়ের পেশায় প্রবেশের সুযোগ পায়। এভাবে সম্পদ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়, যা বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তোলে।
পুঁজি, বিনিয়োগ ও কম্পাউন্ড ইফেক্ট
পুঁজি হলো ধনী হওয়ার মূল ভিত্তি। যার কাছে পুঁজি আছে, সে টাকা দিয়ে আরও টাকা বানানোর সুযোগ পায়। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে বিনিয়োগ। শেয়ার বাজার, ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট বা ডিজিটাল সম্পদ—সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগের মাধ্যমে আয় বাড়ানো সম্ভব, তবে শুরুতে কিছু পুঁজি থাকা অপরিহার্য।
ধনীরা সাধারণত তাদের অর্থ অলস অবস্থায় ফেলে রাখে না। তারা ব্যাংকে রাখলেও সুদের কথা ভাবে, আবার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করে। এই ধারাবাহিক বিনিয়োগই ধীরে ধীরে বিশাল সম্পদে পরিণত হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ শুধু মাসিক আয় ও ব্যয়ের হিসাবেই আটকে থাকে।
এখানে আসে কম্পাউন্ড ইফেক্ট বা চক্রবৃদ্ধি সুদের ধারণা। কম্পাউন্ড ইফেক্ট মানে হলো—আপনার মূল টাকার উপর যেমন সুদ আসে, তেমনি সেই সুদের উপরও আবার সুদ যুক্ত হয়। সময় যত বেশি হয়, এই প্রভাব তত শক্তিশালী হয়। ধনীরা এই বিষয়টি ভালোভাবে বোঝে এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ চালিয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি অল্প বয়সেই নিয়মিত বিনিয়োগ শুরু করে এবং তা দীর্ঘদিন চালিয়ে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত তার সম্পদ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। ধনীরা সাধারণত এই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি রাখে, কিন্তু দরিদ্র বা নতুন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত লাভের আশায় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
আরো পড়ুন: শেয়ার বাজারে সব সময় জেতার আসল কৌশল!
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণও একটি বড় বিষয়। ধনীরা তাদের পুঁজি বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে দেয়, যাকে বলা হয় ডাইভারসিফিকেশন। এতে কোনো একটি খাতে ক্ষতি হলেও পুরো সম্পদ ঝুঁকিতে পড়ে না। এই কৌশল সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রয়োগ করা কঠিন, কারণ তাদের পুঁজি সীমিত।
সবশেষে বলা যায়, পুঁজি, বিনিয়োগ ও কম্পাউন্ড ইফেক্ট—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করেই ধনীদের সম্পদ দ্রুত বাড়িয়ে তোলে। সিস্টেম তাদের এই সুযোগ দেয়, আর তারা তা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগায়। এই বাস্তবতা বোঝাই হলো অর্থনৈতিক সচেতনতার প্রথম ধাপ, যা ভবিষ্যতে আর্থিক স্বাধীনতার পথ খুলে দিতে পারে।
শিক্ষা, নেটওয়ার্ক ও সুযোগের বৈষম্য
সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ার পেছনে শিক্ষা, নেটওয়ার্ক এবং সুযোগের বৈষম্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষা শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়; এটি চিন্তাভাবনার ধরন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা তৈরি করে। কিন্তু এই শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য সমান নয়, আর এখান থেকেই বৈষম্যের সূচনা হয়।
ধনী পরিবারগুলো সাধারণত উন্নত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারে। সেখানে তারা আধুনিক কারিকুলাম, দক্ষ শিক্ষক এবং আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা পায়। এর ফলে তারা শুধু ডিগ্রি নয়, বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর মতো দক্ষতাও অর্জন করে, যা ভবিষ্যতে উচ্চ আয়ের পথ খুলে দেয়।
অন্যদিকে দরিদ্র বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী, গাইডলাইন ও প্রযুক্তির অভাব তাদের পিছিয়ে দেয়। ফলে মেধা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এই শিক্ষাগত বৈষম্যই দীর্ঘমেয়াদে আয়ের ব্যবধান বাড়িয়ে তোলে।
শিক্ষার পাশাপাশি নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নেটওয়ার্ক বলতে বোঝায়—কাকে আপনি চেনেন, কার সাথে আপনার সম্পর্ক আছে এবং সেই সম্পর্ক থেকে আপনি কী ধরনের সুযোগ পেতে পারেন। ধনীরা সাধারণত প্রভাবশালী ও সফল মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পায়, যা তাদের জন্য নতুন দরজা খুলে দেয়।
একটি ভালো নেটওয়ার্ক চাকরি, ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গোপন সুবিধা এনে দেয়। অনেক সময় দক্ষতার চেয়ে পরিচিতি বেশি কাজে লাগে। ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই এই নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে ওঠে, কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের সেই সুযোগ তৈরি করতেই অনেক বছর লেগে যায়।
এই শিক্ষা ও নেটওয়ার্কের অসমতা শেষ পর্যন্ত সুযোগের বৈষম্যে রূপ নেয়। একপক্ষ যেখানে সহজেই ইন্টার্নশিপ, বিদেশে পড়াশোনা বা বড় প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পায়, অন্যপক্ষ সেখানে কেবল মৌলিক চাহিদা পূরণেই হিমশিম খায়। এভাবেই বৈষম্যের চক্র আরও শক্তিশালী হয়।
আইন, কর ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সুবিধা
আইন ও কর ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল স্তম্ভ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই ব্যবস্থাগুলো অনেক সময় ধনীদের পক্ষেই বেশি সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। আইনের জটিলতা, করের কাঠামো এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতির সুযোগ ধনীরা তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে।
ধনীদের হাতে থাকে দক্ষ আইনজীবী ও কর পরামর্শক। তারা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বৈধ উপায়ে কর কমিয়ে দিতে পারে বা সম্পদ অন্য খাতে স্থানান্তর করতে পারে। অথচ সাধারণ মানুষ এসব নিয়মকানুন ভালোভাবে না জানার কারণে আয়ের বড় একটি অংশ কর হিসেবে দিতে বাধ্য হয়।
কর ব্যবস্থায়ও বৈষম্য স্পষ্ট। অনেক দেশে শ্রমজীবী মানুষের আয়ের উপর করের হার বেশি, কিন্তু বিনিয়োগ, শেয়ার বাজার বা সম্পদ বিক্রির উপর কর তুলনামূলকভাবে কম। ফলে যারা মূলত শ্রমের মাধ্যমে আয় করে তারা বেশি চাপে পড়ে, আর যারা পুঁজির মাধ্যমে আয় করে তারা সুবিধা পায়।
আইনগত সুবিধা শুধু করেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবসা শুরু করা, লাইসেন্স পাওয়া বা বড় প্রকল্পে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও ধনীরা এগিয়ে থাকে। তারা সহজেই ব্যাংক ঋণ, সরকারি অনুমোদন ও বিভিন্ন প্রণোদনা পায়, যেখানে সাধারণ উদ্যোক্তাদের জন্য এই পথ অনেক বেশি কঠিন।
অর্থনৈতিক নীতিগুলোও প্রায়শই বড় করপোরেশন ও ধনীদের স্বার্থ রক্ষা করে। ভর্তুকি, কর ছাড় বা বিশেষ সুবিধা সাধারণত বড় বিনিয়োগকারীদের দিকে ঝুঁকে থাকে। এর ফলে ছোট ব্যবসা ও সাধারণ মানুষ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খায়।
সবশেষে বলা যায়, শিক্ষা, নেটওয়ার্ক, আইন ও কর ব্যবস্থা—এই সবকিছু মিলেই এমন একটি সিস্টেম তৈরি হয়েছে, যেখানে ধনীরা আরও ধনী হওয়ার সুযোগ পায়। এই বাস্তবতা বোঝা অত্যন্ত জরুরি, কারণ সচেতনতা থেকেই পরিবর্তনের পথ শুরু হয়। ব্যক্তি পর্যায়ে জ্ঞান, দক্ষতা ও সচেতন সিদ্ধান্তই এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে।
মিডল ক্লাস কেন পিছিয়ে পড়ে?
মিডল ক্লাস বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজের সবচেয়ে পরিশ্রমী অংশ হলেও বাস্তবে তারা ধনী হওয়ার দৌড়ে প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে। এর প্রধান কারণ হলো—এই শ্রেণিটি একদিকে ধনীদের মতো সুযোগ-সুবিধা পায় না, অন্যদিকে দরিদ্রদের মতো সরকারি সহায়তাও খুব সীমিতভাবে পায়। ফলে তারা একটি স্থায়ী চাপের মধ্যে জীবনযাপন করে।
মিডল ক্লাসের আয় সাধারণত নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ। মাসের শেষে বেতন আসে, আর সেই বেতনের মধ্যেই বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার ও সামাজিক দায়িত্ব মেটাতে হয়। সঞ্চয় করার সুযোগ খুব কম থাকে, আর বিনিয়োগের ঝুঁকি নেওয়ার মতো অতিরিক্ত অর্থও হাতে থাকে না।
ধনীরা যেখানে বিনিয়োগ ও সম্পদের মাধ্যমে আয় বাড়াতে পারে, সেখানে মধ্যবিত্তরা মূলত শ্রমনির্ভর আয়ে আটকে থাকে। চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা অর্থনৈতিক মন্দা তাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা পুরো আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে।
শিক্ষা খাতে মধ্যবিত্তরা বড় বিনিয়োগ করলেও তার ফল দীর্ঘমেয়াদে পাওয়া যায়। সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়াতে গিয়ে তারা ঋণ বা সঞ্চয় ভেঙে ফেলে। কিন্তু এই শিক্ষাই যে নিশ্চিতভাবে উচ্চ আয়ের পথ খুলে দেবে—তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
আরো পড়ুন: কিছু মানুষ জন্মগতভাবে এত ভাগ্যবান কেন হয়? এর কি কোন মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে
মিডল ক্লাসের আরেকটি বড় সমস্যা হলো সামাজিক চাপ। সমাজে সম্মান ধরে রাখতে গিয়ে তারা প্রয়োজনের বাইরে খরচ করে ফেলে। বাড়ি, গাড়ি, বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান—সবকিছুতেই ‘স্ট্যাটাস’ ধরে রাখার চেষ্টা তাদের আর্থিক অগ্রগতি ধীর করে দেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মধ্যবিত্তদের আর্থিক শিক্ষা সীমিত। তারা নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকে টাকা জমা রাখে, কিন্তু বিনিয়োগ, প্যাসিভ ইনকাম বা সম্পদ তৈরির কৌশল সম্পর্কে সচেতন নয়। ফলে তারা বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে থাকে।
এই সিস্টেমে সাধারণ মানুষের কর
কর ব্যবস্থা একটি রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও বাস্তবে এই সিস্টেমে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ নিয়মিত ও বাধ্যতামূলকভাবে কর প্রদান করে, কিন্তু তার বিনিময়ে প্রত্যাশিত সুবিধা সবসময় পায় না।
সাধারণ মানুষের আয় মূলত বেতনভিত্তিক হওয়ায় কর কাটার সুযোগ থাকে না। বেতন পাওয়ার আগেই আয়কর কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু ধনী ও বড় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন আইনি কাঠামো ব্যবহার করে কর কমিয়ে দিতে বা বিলম্বিত করতে পারে।
ভ্যাট ও পরোক্ষ কর সাধারণ মানুষের উপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করে। দৈনন্দিন পণ্য—চাল, তেল, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট—সবকিছুতেই কর যুক্ত থাকে। ধনী ও দরিদ্র সবাই একই হারে ভ্যাট দিলেও এর প্রকৃত বোঝা বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের উপর।
এই কর ব্যবস্থার আরেকটি সমস্যা হলো—এর ব্যবহার। সাধারণ মানুষ কর দেয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর উন্নতির আশায়। কিন্তু দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে সেই অর্থের সুফল অনেক সময় জনগণের কাছে পৌঁছায় না।
সাধারণ মানুষের জন্য কর পরিকল্পনার সুযোগ খুব সীমিত। কর আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং পেশাদার পরামর্শের অভাবে তারা কর সাশ্রয়ের বৈধ উপায়গুলো কাজে লাগাতে পারে না। ফলে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি করের বোঝা বহন করে।
এই সিস্টেমে কর সাধারণ মানুষের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিক চাপও তৈরি করে। তারা অনুভব করে—পরিশ্রম তারাই করে, কর তারাই দেয়, কিন্তু সুবিধা ভোগ করে অন্যরা। এই অনুভূতি সমাজে হতাশা ও বৈষম্যের বোধ বাড়িয়ে তোলে।
সবশেষে বলা যায়, মধ্যবিত্ত পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সমস্যা। শিক্ষা, আয়, কর ও সুযোগের এই অসম সিস্টেমে সচেতনতা, আর্থিক শিক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই সাধারণ মানুষের এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র বাস্তব পথ।


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url