শেয়ার বাজারে সব সময় জেতার আসল কৌশল।
শেয়ার বাজারে সব সময় জেতা কি আদৌ সম্ভব? নাকি এটি শুধুই ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার খেলা? বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ আবেগ, গুজব এবং তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে বারবার ক্ষতির মুখে পড়েন। অথচ কিছু নির্দিষ্ট কৌশল আছে, যেগুলো মেনে চললে ঝুঁকি কমিয়ে ধীরে ধীরে লাভের পথে এগোনো সম্ভব। এই লেখায় আমরা জানবো শেয়ার বাজারে সব সময় জেতার আসল কৌশল— যা নতুন ও অভিজ্ঞ উভয় বিনিয়োগকারীর জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেয়ার বাজার কী এবং কেন মানুষ এখানে বিনিয়োগ করে?
শেয়ার বাজার (Share Market) হলো এমন একটি আর্থিক বাজার যেখানে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের মালিকানার অংশ বা শেয়ার সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করে মূলধন সংগ্রহ করে। সহজভাবে বললে, কোনো কোম্পানির একটি অংশ কিনে নেওয়াকেই শেয়ার কেনা বলা হয়। যারা শেয়ার কেনে, তারা সেই কোম্পানির আংশিক মালিক হয়ে যায়। বাংলাদেশে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) শেয়ার বাজারের প্রধান কেন্দ্র।
শেয়ার বাজারের মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানিগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আয় করার সুযোগ তৈরি করা। এখানে শেয়ারের দাম প্রতিদিন চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে ওঠানামা করে। কেউ কম দামে শেয়ার কিনে বেশি দামে বিক্রি করে লাভ করে, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদে ভালো কোম্পানির শেয়ার ধরে রেখে লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড পায়।
মানুষ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে মূলত বেশি মুনাফার আশায়। ব্যাংকে সঞ্চয় রাখলে নির্দিষ্ট হারে সুদ পাওয়া যায়, কিন্তু শেয়ার বাজারে সঠিক পরিকল্পনা ও ধৈর্য থাকলে তুলনামূলকভাবে বেশি রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে মূলধন বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেক বেশি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলা করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকার মূল্য কমে যায়, কিন্তু শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা হলে সেই টাকার মূল্য বাড়ানোর সুযোগ থাকে। ফলে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক মানুষ শেয়ার বাজারকে বেছে নেয়।
অনেকে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে প্যাসিভ ইনকামের জন্য। কিছু কোম্পানি নিয়মিত ডিভিডেন্ড প্রদান করে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস হয়ে ওঠে। অবসরকালীন জীবন, সন্তানদের শিক্ষা বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য এই ধরনের আয় অনেকের কাছেই আকর্ষণীয়।
এছাড়াও শেয়ার বাজার মানুষকে অর্থনৈতিক জ্ঞান ও আর্থিক শৃঙ্খলা শেখায়। বাজার বিশ্লেষণ, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বোঝা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একজন বিনিয়োগকারী ধীরে ধীরে আরও সচেতন ও দক্ষ হয়ে ওঠে। তবে মনে রাখতে হবে, শেয়ার বাজারে যেমন লাভের সুযোগ আছে, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে। তাই জ্ঞান, ধৈর্য ও সঠিক কৌশল ছাড়া বিনিয়োগ করা উচিত নয়।
শেয়ার বাজারে সব সময় জেতা—মিথ নাকি বাস্তবতা?
শেয়ার বাজারে সব সময় জেতা—এই ধারণাটি নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় শোনালেও বাস্তবতার সঙ্গে এর বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট কিছু কৌশল বা গোপন সূত্র জানলেই শেয়ার বাজারে কখনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু বাস্তবে শেয়ার বাজার এমন একটি জায়গা যেখানে অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও পরিবর্তন সব সময় বিদ্যমান। তাই প্রশ্ন ওঠে—শেয়ার বাজারে সব সময় জেতা কি সত্যিই সম্ভব, নাকি এটি শুধুই একটি মিথ?
বাস্তবতা হলো, শেয়ার বাজারে দীর্ঘমেয়াদে লাভ করা সম্ভব হলেও প্রতিটি লেনদেনে জেতা প্রায় অসম্ভব। বাজারের দাম নির্ভর করে অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কোম্পানির পারফরম্যান্স, বিনিয়োগকারীদের মনোভাব এবং বৈশ্বিক ঘটনাবলীর ওপর। এই সব বিষয়ের অনেকগুলোই একজন বিনিয়োগকারীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে কখনো না কখনো ক্ষতির মুখোমুখি হওয়াটা স্বাভাবিক।
যারা দাবি করে যে তারা সব সময় শেয়ার বাজারে জেতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বাস্তব চিত্রটি পুরোপুরি তুলে ধরে না। অনেক সময় লাভের গল্প বেশি প্রচার করা হয়, কিন্তু ক্ষতির কথা আড়াল করা হয়। বাস্তবে সফল বিনিয়োগকারীরাও স্বীকার করেন যে তাদের পথচলায় ক্ষতি ছিল, তবে তারা সেই ক্ষতি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—শেয়ার বাজারে “সব সময় জেতা” না হলেও “দীর্ঘমেয়াদে জেতা” সম্ভব। যারা ধৈর্য ধরে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা মেনে, ভালো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেন এবং আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেন না, তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লাভবান হন। অর্থাৎ জয়ের মানে যদি প্রতিদিন লাভ করা বোঝায়, তাহলে তা মিথ; কিন্তু জয়ের মানে যদি দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ বৃদ্ধি হয়, তাহলে তা বাস্তব।
শেয়ার বাজারকে তাই একটি খেলাধুলার মাঠের মতো না দেখে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জায়গা হিসেবে দেখা উচিত। এখানে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবসম্মত প্রত্যাশাই সফলতার চাবিকাঠি। অতিরিক্ত লোভ, দ্রুত ধনী হওয়ার চিন্তা এবং “সব সময় জিততেই হবে” মানসিকতা বিনিয়োগকারীদের বড় ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।
সবশেষে বলা যায়, শেয়ার বাজারে সব সময় জেতা একটি মিথ, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া একেবারেই বাস্তবতা। তাই জেতার স্বপ্ন নয়, বরং টেকসই ও সচেতন বিনিয়োগই হওয়া উচিত প্রতিটি বিনিয়োগকারীর মূল লক্ষ্য।
শেয়ার বাজারে জেতার আসল ও কার্যকর কৌশল
শেয়ার বাজারে জেতার আসল কৌশল কোনো গোপন সূত্র বা রাতারাতি ধনী হওয়ার ট্রিক নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, ধৈর্যনির্ভর এবং বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ প্রক্রিয়া। অনেক নতুন বিনিয়োগকারী মনে করেন প্রতিদিন ট্রেড করে বা অন্যের পরামর্শে শেয়ার কিনলেই লাভ হবে। বাস্তবে সফল বিনিয়োগকারীরা বাজারকে ব্যবসার মতো দেখেন এবং সিদ্ধান্ত নেন তথ্য, বিশ্লেষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।
কার্যকর কৌশলের প্রথম ধাপ হলো স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ। আপনি স্বল্পমেয়াদি ট্রেডার নাকি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী—এই সিদ্ধান্ত পরিষ্কার না হলে ভুল শেয়ার নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে জেতার জন্য ভালো আর্থিক ভিত্তি থাকা কোম্পানি, নিয়মিত মুনাফা, শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো মৌলিক বিশ্লেষণ (Fundamental Analysis)। কোনো কোম্পানির আয়, লাভ, ঋণ, বাজারে অবস্থান ও খাতভিত্তিক ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই না করে বিনিয়োগ করা জুয়ার শামিল। পাশাপাশি টেকনিক্যাল বিশ্লেষণ বাজারের প্রবেশ ও প্রস্থান সময় নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে, তবে সেটিই একমাত্র ভরসা হওয়া উচিত নয়।
আরেকটি কার্যকর কৌশল হলো ধৈর্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। শেয়ার বাজারে হঠাৎ ওঠানামা স্বাভাবিক বিষয়। অল্প লাভ দেখেই বিক্রি করে দেওয়া বা সামান্য দরপতনে ভয় পেয়ে শেয়ার ছেড়ে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়। সফল বিনিয়োগকারীরা বাজারের শব্দ (noise) উপেক্ষা করে নিজেদের পরিকল্পনায় অটল থাকেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবেগ নিয়ন্ত্রণ। লোভ, ভয় ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস—এই তিনটি আবেগ বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় শত্রু। শেয়ার বাজারে জেতার আসল কৌশল হলো আবেগ নয়, বরং যুক্তি ও তথ্যকে প্রাধান্য দেওয়া।
ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করার বুদ্ধিমান উপায়
শেয়ার বাজারে ঝুঁকি ছাড়া লাভ নেই—এটি যেমন সত্য, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন ঝুঁকি সর্বনাশ ডেকে আনে। তাই বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীরা লাভের আগে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেন। ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণ (Diversification)। অর্থাৎ সব টাকা এক বা দুইটি শেয়ারে বিনিয়োগ না করে বিভিন্ন খাত ও কোম্পানিতে ভাগ করে বিনিয়োগ করা।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো নিজের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী বিনিয়োগ করা। ধার করা টাকা বা জরুরি প্রয়োজনের অর্থ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করলে মানসিক চাপ বেড়ে যায় এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারী সবসময় এমন অর্থ বিনিয়োগ করেন, যা কিছু সময়ের জন্য আটকে থাকলেও তার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলবে না।
স্টপ লস (Stop Loss) ব্যবহার করাও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর কৌশল। নির্দিষ্ট দামের নিচে শেয়ার নেমে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। যদিও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে স্টপ লস সব সময় প্রযোজ্য নয়, তবে স্বল্পমেয়াদি ট্রেডিংয়ে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বুদ্ধিমান উপায় হলো অতিরিক্ত ট্রেডিং এড়িয়ে চলা। প্রতিদিন কেনা-বেচা করলে ব্রোকারেজ খরচ বাড়ে এবং ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বাজারে সব সময় সুযোগ থাকবে—এই বিশ্বাস রেখে ধৈর্যের সঙ্গে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করাই নিরাপদ পথ।
সবশেষে, নিয়মিত শেখা ও নিজের ভুল বিশ্লেষণ করা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। বাজার থেকে ক্ষতি হলে হতাশ না হয়ে সেটি কেন হলো, কোথায় ভুল হয়েছে—তা বিশ্লেষণ করলে ভবিষ্যতে একই ভুল পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, শেয়ার বাজারে জেতার আসল কৌশল হলো সঠিক জ্ঞান, ধৈর্য ও শৃঙ্খলার সমন্বয় এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বুদ্ধিমান প্রয়োগ। যে বিনিয়োগকারী ঝুঁকিকে সম্মান করে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলে, দীর্ঘমেয়াদে সফলতা তার কাছেই ধরা দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কেন সবচেয়ে নিরাপদ
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে শেয়ার বাজারে সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল বলা হয় কারণ এটি সময়ের শক্তিকে কাজে লাগায়। শেয়ার বাজার স্বল্পমেয়াদে অস্থির হলেও দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে অর্থনীতি, কোম্পানির প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীর পক্ষে কাজ করে। তাই সাময়িক দরপতন বা বাজারের ওঠানামা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায় না।
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ঝুঁকি ধীরে ধীরে কমে আসা। স্বল্পমেয়াদি ট্রেডিংয়ে প্রতিদিন বাজার পর্যবেক্ষণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত ও মানসিক চাপের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ভালো মৌলিক ভিত্তি থাকা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে বাজারের অস্থিরতা স্বাভাবিকভাবেই সামলে নেওয়া যায়। সময় যত বাড়ে, লাভের সম্ভাবনাও তত স্থিতিশীল হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো কম আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত। স্বল্পমেয়াদে লোভ, ভয় ও গুজব বিনিয়োগকারীকে ভুল পথে পরিচালিত করে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এই আবেগের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকে, কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কোম্পানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও আর্থিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে। ফলে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকিও কমে যায়।
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিরাপদ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো কম লেনদেন খরচ। ঘন ঘন শেয়ার কেনা-বেচা করলে ব্রোকারেজ চার্জ ও কর বেড়ে যায়, যা মোট লাভ কমিয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে শেয়ার ধরে রাখলে এই অতিরিক্ত খরচ অনেকটাই এড়ানো যায়, ফলে প্রকৃত মুনাফা বেশি থাকে।
চক্রবৃদ্ধি সুদের (Compounding) শক্তিও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে নিরাপদ ও লাভজনক করে তোলে। কোম্পানির মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগের মাধ্যমে সময়ের সাথে সাথে মূলধন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। স্বল্পমেয়াদে এই প্রভাব বোঝা না গেলেও দীর্ঘ সময়ে এটি বিশাল পার্থক্য গড়ে তোলে।
সবশেষে বলা যায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ মানে ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। যারা দ্রুত লাভের আশায় ঝুঁকি নিতে চান না এবং নিরাপদভাবে সম্পদ বৃদ্ধি করতে চান, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ। শেয়ার বাজারে প্রকৃত নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে সময়কে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর মধ্যেই।
নতুন বিনিয়োগকারীদের সাধারণ ভুলগুলো
শেয়ার বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই কিছু সাধারণ ভুল করেন, যার ফলে অল্প সময়েই তারা হতাশ হয়ে পড়েন। সবচেয়ে বড় ভুল হলো পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রস্তুতি ছাড়াই বিনিয়োগ শুরু করা। অনেকেই বন্ধুর পরামর্শ, ফেসবুক গ্রুপের গুজব বা ইউটিউব ভিডিও দেখে শেয়ার কেনেন, কিন্তু কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার ধরন বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই করেন না। এর ফলে ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং লোকসানের সম্ভাবনাও বেশি হয়।
আরেকটি বড় ভুল হলো দ্রুত লাভের আশায় অতি ঝুঁকি নেওয়া। নতুন বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই স্বল্প সময়ে বেশি টাকা আয়ের চিন্তায় ছোট বা দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। বাজার সামান্য নড়াচড়া করলেই তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেন। এই অতিরিক্ত লোভ ও ভয়ের কারণেই অনেকেই মূলধন হারান।
অনেকে আবার বিনিয়োগের আগে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেন না। কেন বিনিয়োগ করছেন, কতদিনের জন্য করছেন এবং কতটা ঝুঁকি নিতে পারবেন—এই বিষয়গুলো স্পষ্ট না থাকলে সিদ্ধান্ত সবসময় এলোমেলো হয়ে যায়। লক্ষ্যহীন বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া কঠিন করে তোলে।
পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য না করাও নতুন বিনিয়োগকারীদের একটি বড় ভুল। সব টাকা একটি বা দুটি শেয়ারে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। কোনো একটি কোম্পানি বা খাতে সমস্যা হলে পুরো বিনিয়োগ ক্ষতির মুখে পড়ে। কিন্তু বিভিন্ন খাত ও কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
সবশেষে বলা যায়, ধৈর্যের অভাব নতুন বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় শত্রু। বাজার সাময়িকভাবে পড়ে গেলেই শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া বা অল্প লাভ পেলেই বেরিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়। শেয়ার বাজারে সফল হতে হলে সময় ও ধৈর্য—এই দুটোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেয়ার বাজারে সফল হওয়ার শেষ পরামর্শ
শেয়ার বাজারে সফল হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো শেখার মানসিকতা ধরে রাখা। বাজার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়, তাই পুরনো ধারণায় আটকে থাকলে চলবে না। নিয়মিত বাজার বিশ্লেষণ, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পড়া এবং অর্থনৈতিক খবরের দিকে নজর রাখা একজন বিনিয়োগকারীকে অন্যদের থেকে এগিয়ে রাখে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা। লোভ ও ভয়—এই দুই আবেগ শেয়ার বাজারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। বাজার যখন বাড়ে তখন অতিরিক্ত লোভে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আর বাজার পড়লে ভয়ের কারণে ভালো শেয়ারও কম দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আবেগের বদলে যুক্তি ও পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাও শেয়ার বাজারে সফল হওয়ার অন্যতম কৌশল। স্বল্পমেয়াদে বাজারের ওঠানামা স্বাভাবিক, কিন্তু দীর্ঘ সময়ে ভালো কোম্পানির শেয়ার সাধারণত মূল্য বৃদ্ধি করে। তাই ধৈর্য ধরে বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শেখাও অত্যন্ত জরুরি। কখন কত টাকা বিনিয়োগ করবেন, কতটা লোকসান মেনে নিতে পারবেন এবং কখন বেরিয়ে আসবেন—এই বিষয়গুলো আগে থেকেই নির্ধারণ করা উচিত। এতে হঠাৎ বড় ক্ষতির সম্ভাবনা কমে যায় এবং বিনিয়োগ আরও নিয়ন্ত্রিত থাকে।
সবশেষ পরামর্শ হলো নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝা। সব বিনিয়োগকারী একই রকম নন। কারও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বেশি, কারও কম। নিজের আর্থিক অবস্থা ও মানসিক প্রস্তুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিনিয়োগ করলেই দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার বাজার থেকে স্থিতিশীল লাভ অর্জন করা সম্ভব।


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url