শবে বরাতের কি কি ইবাদত করতে হয়?
🌙 শবে বরাত—মাগফিরাত ও রহমতের মহিমান্বিত রজনী
শবে বরাত এমন একটি বরকতময় রাত, যেদিন আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন এবং আগামীর ভাগ্য নির্ধারণ করা হয় বলে বর্ণিত আছে। এই পবিত্র রাতটি আত্মশুদ্ধি, তাওবা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক বিশেষ সুযোগ।
কিন্তু অনেকেই জানেন না— শবে বরাতে কোন কোন ইবাদত সবচেয়ে উত্তম, কীভাবে আমল করলে তা সুন্নাহসম্মত হয় এবং কোন কাজগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। সঠিক জ্ঞান না থাকলে অনেক সময় ভুল আমলে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
🤲 এই পোস্টে আপনি জানতে পারবেন— শবে বরাতে করণীয় ইবাদতসমূহ, নফল নামাজ, দোয়া, জিকির ও রোজার ফজিলত দলিলভিত্তিক ও সহজ ভাষায়। তাই পুরো লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
শবে বরাত কী ও এর গুরুত্ব
শবে বরাত ইসলামি ক্যালেন্ডারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ রাত। এটি শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, অর্থাৎ ১৫ শাবানের রাত। “শবে বরাত” শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো মুক্তির রাত বা নাজাতের রাত। এই রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন।
ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, শবে বরাত এমন একটি রাত, যে রাতে আগামী এক বছরের জন্য মানুষের রিজিক, হায়াত-মউত এবং গুরুত্বপূর্ণ ফয়সালা লিপিবদ্ধ করা হয়—আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের ভিত্তিতে। এজন্যই এই রাতকে মুসলমানরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে থাকেন। বিশেষ করে উপমহাদেশে এই রাত ইবাদত, দোয়া ও তওবার মাধ্যমে অতিবাহিত করার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
শবে বরাতের গুরুত্ব এই কারণেও বেশি যে, এই রাত মানুষকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ করে দেয়। গুনাহ থেকে ফিরে আসা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং নিজের আমল ঠিক করার জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। এই রাতে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের দরজা বিশেষভাবে উন্মুক্ত থাকে—এমন বিশ্বাস বহু আলেম ও ইসলামি বর্ণনায় পাওয়া যায়।
শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস
শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিসে বর্ণনা পাওয়া যায়। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে—এক রাতে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দোয়া করতে দেখেন। তখন নবী ﷺ তাকে জানান যে, এই রাতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
আরেক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—“শাবান মাসের মধ্যরাতে (শবে বরাতে) আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” (ইবনে মাজাহ)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, এই রাত ক্ষমা লাভের এক বিরাট সুযোগ হলেও অন্তরের রোগ যেমন হিংসা ও শিরক থেকে মুক্ত থাকা জরুরি।
হাদিসসমূহ থেকে আরও বোঝা যায়, শবে বরাতের মূল ফজিলত হলো ক্ষমা প্রার্থনা, তওবা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। যদিও এই রাতে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা সুন্নত ইবাদত নির্ধারিত নেই, তবে নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে রাতটি কাটানো অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ বলে আলেমরা উল্লেখ করেছেন।
শবে বরাতে ফরজ ও নফল ইবাদত
শবে বরাত একটি ফজিলতপূর্ণ রাত হলেও এই রাতে কোনো নতুন ফরজ ইবাদত নির্ধারিত হয়নি—এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। অর্থাৎ, দৈনন্দিন জীবনে যে ফরজ ইবাদতগুলো আমাদের ওপর আবশ্যক, সেগুলোই শবে বরাতেও ফরজ হিসেবে আদায় করতে হবে। এর মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা (যদি রোজার দিন হয়), যাকাতের হিসাব ঠিক রাখা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা অন্যতম।
বিশেষ করে শবে বরাতের রাতে এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক আলেমের মতে, এই দুই ওয়াক্ত নামাজ সঠিকভাবে আদায় করা হলে শবে বরাতের বড় একটি ফজিলত অর্জিত হয়। কারণ ফরজ ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি শবে বরাতে নফল ইবাদতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দরুদ শরিফ, ইস্তিগফার ও দোয়া—এসব ইবাদতের মাধ্যমে এই রাত কাটানো উত্তম। এই রাতে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে বান্দার তওবা কবুল করেন—এমন বিশ্বাস বহু সহিহ বর্ণনা ও আলেমদের বক্তব্যে পাওয়া যায়।
এছাড়া শবে বরাতে অন্তরের ইবাদতও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও শত্রুতা থেকে নিজেকে মুক্ত করা এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা করা এই রাতের অন্যতম মূল শিক্ষা। কারণ হাদিসে এসেছে, বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তির ক্ষমা এই রাতে বিলম্বিত হয়।
শবে বরাতে নফল নামাজ আদায়ের নিয়ম
শবে বরাতে নফল নামাজ আদায়ের জন্য ইসলামি শরিয়তে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা নির্ধারিত পদ্ধতি বেঁধে দেওয়া হয়নি। তাই এই রাতে নফল নামাজ আদায় করতে হলে সাধারণ নফল নামাজের নিয়মেই পড়তে হবে। সাধারণত দুই রাকাআত করে নফল নামাজ আদায় করাই উত্তম ও নিরাপদ পদ্ধতি।
প্রতি দুই রাকাআত নফল নামাজে সূরা ফাতিহার সঙ্গে কুরআনের যেকোনো সূরা পড়া যায়। কেউ চাইলে ছোট সূরা পড়তে পারেন, আবার কেউ চাইলে বড় সূরাও পড়তে পারেন—এতে কোনো বাধা নেই। নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
অনেক মানুষ শবে বরাতে ১০, ১২ বা ১০০ রাকাআত নামাজের কথা বলে থাকেন। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট নিয়মে নামাজ আদায় করার বিষয়ে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশনা নেই। তাই অতিরঞ্জন ও বিদআত থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি।
নফল নামাজের পাশাপাশি শবে বরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা বিশেষভাবে উত্তম। কারণ তাহাজ্জুদ এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অত্যন্ত সহায়ক। নামাজের পর ইস্তিগফার, দরুদ শরিফ ও দোয়ার মাধ্যমে রাত কাটালে এই রাতের প্রকৃত ফজিলত অর্জিত হয়।
সবশেষে বলা যায়, শবে বরাতে নফল নামাজের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মশুদ্ধি ও গুনাহ থেকে ফিরে আসা। সংখ্যা নয়, বরং নিয়ত ও আন্তরিকতাই এই রাতের আসল সৌন্দর্য।
কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের গুরুত্ব
শবে বরাতের রাত আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক বিশেষ সুযোগ, আর এই সুযোগকে কাজে লাগানোর অন্যতম উত্তম মাধ্যম হলো কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির। কোরআন হলো আল্লাহর কালাম, যা পাঠ করার মাধ্যমে অন্তর প্রশান্ত হয় এবং ঈমান মজবুত হয়। শবে বরাতের মতো বরকতময় রাতে কোরআন তিলাওয়াত করলে এর সওয়াব ও প্রভাব আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
কোরআন তিলাওয়াত শুধু সওয়াবের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের আত্মশুদ্ধির একটি কার্যকর উপায়। এই রাতে ধীরে-সুস্থে, মনোযোগ সহকারে কোরআন পড়া এবং অর্থ বোঝার চেষ্টা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর বাণী হৃদয়ে ধারণ করলে গুনাহ থেকে ফিরে আসার শক্তি তৈরি হয়, যা শবে বরাতের মূল শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
জিকির অর্থ হলো আল্লাহকে স্মরণ করা। “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”—এই সহজ জিকিরগুলো শবে বরাতের রাতে বেশি বেশি করা উচিত। জিকিরের মাধ্যমে অন্তরের কালিমা দূর হয় এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
বিশেষ করে নিঃশব্দে, একান্ত মনে জিকির করা এই রাতের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এতে রিয়া বা লোক দেখানো থেকে বাঁচা যায় এবং ইবাদতে আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়। কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির একসঙ্গে চলতে থাকলে এই রাত ইবাদতে ভরপুর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
শবে বরাতে দোয়া ও ইস্তেগফার
শবে বরাত মূলত ক্ষমা প্রার্থনার রাত। এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন—যদি তারা আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তেগফার করে। তাই শবে বরাতে দোয়া ও ইস্তেগফার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। নিজের জীবনের গুনাহ, ভুল ও অবহেলার জন্য আল্লাহর কাছে লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাওয়াই এই রাতের মূল উদ্দেশ্য।
ইস্তেগফারের সবচেয়ে সহজ ও পরিচিত বাক্য হলো—“আস্তাগফিরুল্লাহ”। এই ছোট বাক্যটির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা যায়। পাশাপাশি “আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ারহামনি” কিংবা অন্য মাসনুন ইস্তেগফারও পড়া যেতে পারে। বারবার, মন থেকে ইস্তেগফার করলে আল্লাহ বান্দার পাপ ক্ষমা করেন—এমন বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।
দোয়ার ক্ষেত্রে শবে বরাতে নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, রিজিকের বরকত, সুস্থতা, ঈমানের দৃঢ়তা এবং মৃত্যুর পর মুক্তির জন্য দোয়া করা উত্তম। নিজের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা এই রাতের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে।
দোয়া করার সময় কান্না, অনুশোচনা ও বিনয় প্রকাশ করা খুবই ফজিলতপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বান্দার হৃদয়ের অবস্থা দেখেন, শব্দের সৌন্দর্য নয়। তাই সুন্দর আরবি জানা না থাকলেও নিজের ভাষায় মন খুলে দোয়া করলেই তা আল্লাহ কবুল করেন।
সবশেষে বলা যায়, শবে বরাতে দোয়া ও ইস্তেগফার হলো আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ সুযোগ। এই রাতে আল্লাহর দরজায় ফিরে এসে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে তওবা করতে পারি, তবে আমাদের জীবন নতুনভাবে শুরু হওয়ার পথ খুলে যায়।
শবে বরাতের রোজা: হুকুম ও ফজিলত
শবে বরাতের রাতের পরের দিন অর্থাৎ ১৫ই শাবান রোজা রাখাকে শবে বরাতের রোজা বলা হয়। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এই রোজা নফল, ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তবে হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন। এ কারণে শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা একটি ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে গণ্য হয়।
অনেক আলেমের মতে, শবে বরাতের রোজাকে আলাদা কোনো বিশেষ ইবাদত মনে করে ফরজের মতো গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নয়। বরং এটি শাবান মাসের নফল রোজার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে আদায় করা উত্তম। নিয়ত হওয়া উচিত—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও সুন্নাহর অনুসরণ।
এই রোজার অন্যতম ফজিলত হলো আত্মসংযম ও তাকওয়া বৃদ্ধি। শবে বরাতের রাতে ইবাদতের পর দিনব্যাপী রোজা রাখলে নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকার মানসিক শক্তি তৈরি হয়। অনেক ইসলামী স্কলার বলেন, শাবান মাসের রোজা রমজানের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত নফল রোজা রাখতে পারেন না, তাঁরা শবে বরাতের পরদিন রোজা রেখে এই বরকতময় সময়কে কাজে লাগাতে পারেন। তবে কারও শারীরিক অসুস্থতা বা শরিয়তসম্মত ওজর থাকলে রোজা না রাখলেও কোনো গুনাহ নেই।
শবে বরাতে করণীয় আমলসমূহ
শবে বরাত এমন একটি রাত, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ দয়া ও রহমত বর্ষণ করেন। তাই এই রাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে, যেগুলো কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে পালন করা উত্তম। প্রথম ও প্রধান আমল হলো নফল নামাজ আদায় করা। একাকী, নীরবে দুই বা চার রাকাত করে নফল নামাজ পড়া সবচেয়ে নিরাপদ ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কোরআন তিলাওয়াত। যতটুকু সম্ভব, মনোযোগ ও খুশু সহকারে কোরআন পাঠ করা উচিত। কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তর পরিশুদ্ধ হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়—যা শবে বরাতের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তৃতীয় আমল হলো ইস্তেগফার ও তওবা। “আস্তাগফিরুল্লাহ” বেশি বেশি পাঠ করা এবং নিজের অতীত গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এই রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা আন্তরিক তওবাকারী বান্দাকে ক্ষমা করে দেন—এটাই শবে বরাতের মূল বার্তা।
চতুর্থ আমল হিসেবে দোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, রিজিকের বরকত, সুস্থতা, ঈমানের হেফাজত এবং পরিবার ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা উচিত। দোয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শব্দ জানা জরুরি নয়; নিজের ভাষায় মন খুলে দোয়া করলেই আল্লাহ তা কবুল করেন।
সবশেষে বলা যায়, শবে বরাতে করণীয় আমলসমূহের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া, আত্মশুদ্ধি অর্জন করা এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া। লোক দেখানো বা বিদআত থেকে দূরে থেকে, সুন্নাহসম্মত আমল করাই এই রাতের সর্বোত্তম ব্যবহার।
শবে বরাতে যে কাজগুলো বর্জন করা উচিত
শবে বরাত একটি ফজিলতপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ রাত হলেও এই রাতে কিছু কাজ থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় অজ্ঞতা বা ভুল ধারণার কারণে এমন কিছু আমল করা হয়, যা ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। তাই শবে বরাতের প্রকৃত ফজিলত লাভ করতে হলে প্রথমেই বর্জনীয় কাজগুলো জানা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বর্জন করা উচিত তা হলো বিদআত। নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করে বিশেষ নামাজ, দলবদ্ধভাবে জিকির, বা শরিয়তসম্মত প্রমাণ ছাড়া নতুন ইবাদতের পদ্ধতি চালু করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। ইবাদতে নতুন কিছু সংযোজন না করে কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করাই নিরাপদ।
শবে বরাতে আতশবাজি, হইচই ও অপ্রয়োজনীয় উৎসবমুখর আচরণ থেকেও বিরত থাকতে হবে। এটি ইবাদতের রাত, আনন্দ-উল্লাসের নয়। অনেক এলাকায় এই রাতে বাজি ফোটানো বা রাতভর অপ্রয়োজনীয় আড্ডা দেওয়া হয়, যা শবে বরাতের আত্মিক গুরুত্বকে নষ্ট করে।
আরেকটি বর্জনীয় কাজ হলো কবরকে কেন্দ্র করে অতিরঞ্জিত আচরণ। কবর জিয়ারত করা বৈধ হলেও, সেখানে প্রদীপ জ্বালানো, মোমবাতি লাগানো, বা কবর থেকে কিছু আশা করা শরিয়তসম্মত নয়। ইবাদত কেবল আল্লাহর জন্য—এ বিশ্বাস দৃঢ় রাখতে হবে।
এছাড়া এই রাতে গুনাহের কাজ চালিয়ে যাওয়া সবচেয়ে বড় ভুল। নামাজ বা দোয়া করেও যদি গীবত, মিথ্যা, হারাম উপার্জন বা অন্যায় কাজ পরিত্যাগ না করা হয়, তাহলে শবে বরাতের প্রকৃত বরকত পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই গুনাহ বর্জনের দৃঢ় নিয়ত করাই এই রাতের অন্যতম শিক্ষা।
নারীদের জন্য শবে বরাতের ইবাদত
শবে বরাতে নারীদের জন্য ইবাদতের সুযোগ পুরুষদের মতোই উন্মুক্ত। তবে তাঁদের ইবাদতের ধরন হতে পারে পারিবারিক ও বাস্তব জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঘরের ভেতর থেকেই নারীরা এই পবিত্র রাতের ফজিলত অর্জন করতে পারেন—এর জন্য বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
নারীদের জন্য শবে বরাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো নফল নামাজ আদায়। ঘরের নিরিবিলি স্থানে, একাকী দুই বা চার রাকাত করে নফল নামাজ পড়া উত্তম। লোক দেখানোর উদ্দেশ্য ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আদায় করা নামাজই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।
যেসব নারী নামাজ পড়তে অক্ষম (হায়েজ বা নেফাস অবস্থায়), তাঁদের জন্যও শবে বরাতের ইবাদতের দরজা বন্ধ নয়। তাঁরা জিকির, দরুদ শরিফ, ইস্তেগফার ও দোয়া করতে পারেন। মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তওবা করা এই অবস্থাতেও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
নারীরা এই রাতে পরিবার ও সন্তানের জন্য দোয়া করতে পারেন। একজন মায়ের দোয়া আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য। নিজের ঈমান, সংসারের শান্তি, সন্তানদের দ্বীনি ও দুনিয়াবি কল্যাণের জন্য দোয়া করা শবে বরাতের অন্যতম সুন্দর আমল।
সবশেষে বলা যায়, নারীদের জন্য শবে বরাতের ইবাদতের মূল লক্ষ্য হলো আত্মশুদ্ধি, তওবা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। বাড়ির কাজ, সন্তান লালন বা পারিবারিক দায়িত্ব পালনের মাঝেও আন্তরিক নিয়ত থাকলে আল্লাহ তাআলা এই রাতের বরকত দান করেন। নিয়মিত আমল ও গুনাহ বর্জনের প্রতিজ্ঞাই শবে বরাতের প্রকৃত শিক্ষা।
শবে বরাত সম্পর্কিত ভুল ধারণা
শবে বরাত একটি মর্যাদাপূর্ণ রাত হলেও এ রাতকে ঘিরে সমাজে বহু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এসব ভুল বিশ্বাস অনেক সময় মানুষকে প্রকৃত ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই শবে বরাতের সঠিক তাৎপর্য বুঝতে হলে আগে এই ভুল ধারণাগুলো সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি।
সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—শবে বরাতের রাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত নামাজ পড়তেই হবে। অনেকেই মনে করেন ১০০ রাকাত বা নির্দিষ্ট সূরা দিয়ে নামাজ না পড়লে ইবাদত পূর্ণ হয় না। প্রকৃতপক্ষে কোরআন ও সহিহ হাদিসে এ ধরনের নির্দিষ্ট পদ্ধতির কোনো প্রমাণ নেই। নফল নামাজ যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই পড়া উত্তম।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো—এই রাতে ভাগ্য চূড়ান্তভাবে লিখে ফেলা হয়। আল্লাহ তাআলা সবকিছু পূর্ব থেকেই জানেন ও নির্ধারণ করেন। শবে বরাত ক্ষমা ও রহমতের রাত হলেও ভাগ্য পরিবর্তন কেবল এই একটি রাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ—এমন ধারণার শরিয়তসম্মত ভিত্তি নেই।
অনেকে মনে করেন শবে বরাতে কবরবাসীরা ঘরে ফিরে আসে। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ধারণা। ইসলাম অনুযায়ী মৃত্যুর পর আত্মা নির্দিষ্ট নিয়মে থাকে; তারা ইচ্ছামতো পৃথিবীতে ফিরে আসে না। এ ধরনের বিশ্বাস থেকে দূরে থাকা ঈমানের জন্য জরুরি।
এছাড়া শবে বরাতে আতশবাজি, আলোকসজ্জা ও উৎসব করা ইবাদতের অংশ—এমন ধারণাও ভুল। শবে বরাত হলো ইবাদত, তওবা ও আত্মশুদ্ধির রাত; আনন্দ-উৎসবের নয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
প্রশ্ন ১: শবে বরাতের রাতে কি জাগতে হবে?
উত্তর: জাগা ফরজ নয়। তবে যারা ইবাদতের উদ্দেশ্যে জাগতে পারেন, তাদের জন্য এটি ফজিলতপূর্ণ।
প্রশ্ন ২: শবে বরাতে কবর জিয়ারত করা কি জরুরি?
উত্তর: জরুরি নয়। সুযোগ ও পরিবেশ অনুকূল হলে করা যেতে পারে, তবে এটিকে বাধ্যতামূলক ভাবা ভুল।
প্রশ্ন ৩: নারীরা কি শবে বরাতে ইবাদত করতে পারবেন?
উত্তর: অবশ্যই পারবেন। নামাজ ছাড়াও জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে ইবাদত করা যায়।
প্রশ্ন ৪: এই রাতে কি বিশেষ দোয়া আছে?
উত্তর: নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। নিজের ভাষায় আন্তরিকভাবে দোয়া করাই উত্তম।
প্রশ্ন ৫: শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা কি সুন্নত?
উত্তর: রোজা রাখা ভালো আমল, তবে এটিকে শবে বরাতের সাথে আবশ্যিকভাবে যুক্ত করা ঠিক নয়।
উপসংহার
শবে বরাত হলো আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা, তওবা এবং আত্মশুদ্ধির এক মহামূল্যবান সুযোগ। এই রাতকে ঘিরে প্রচলিত ভুল ধারণা ও বিদআত পরিহার করে কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক আমলে মনোযোগী হওয়াই একজন মুমিনের দায়িত্ব।
সঠিক জ্ঞান ছাড়া ইবাদত করলে তার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। তাই শবে বরাতকে উৎসব বা লোকাচার নয়, বরং নিজেকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে এই রাতের প্রকৃত বরকত ও রহমত অর্জনের তাওফিক দান করেন—আমিন।

.png)
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url