OrdinaryITPostAd

ইন্স্যুরেন্স বা বিমা করার আগে যে ৫টি ভুল করলে আপনার টাকা জলে যাবে!

আজকাল নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় অনেকেই ইন্স্যুরেন্স বা বিমা করেন। কিন্তু সঠিক তথ্য না জেনে বিমা করলে সেই নিরাপত্তাই একসময় বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক মানুষ বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দেওয়ার পরও ক্লেইমের সময় বুঝতে পারেন— একটি ছোট ভুলেই তাঁর কষ্টার্জিত টাকা প্রায় জলে গেছে।

পলিসির শর্ত না বোঝা, ভুল এজেন্টের কথায় বিশ্বাস করা কিংবা নিজের প্রয়োজন না ভেবে বিমা নেওয়া— এমন কিছু সাধারণ ভুল আছে, যা বেশিরভাগ মানুষই অজান্তে করে ফেলেন।

👉 এই পোস্টে আমরা তুলে ধরেছি ইন্স্যুরেন্স বা বিমা করার আগে করা সেই ৫টি মারাত্মক ভুল, যেগুলো জানা থাকলে আপনি নিজের টাকা ও ভবিষ্যৎ—দুটোই নিরাপদ রাখতে পারবেন। তাই পুরো পোস্টটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

ভূমিকা

বর্তমান অনিশ্চিত জীবনে নিরাপত্তা ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অপ্রত্যাশিত মৃত্যু—এই ঘটনাগুলো আমাদের জীবনে যে কোনো সময় বড় আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে। ঠিক এই জায়গাতেই ইন্স্যুরেন্স বা বিমা মানুষের জীবনে একটি নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

অনেকেই মনে করেন, বিমা শুধু ধনী মানুষের জন্য বা বয়স বেশি হলে নেওয়ার বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ইন্স্যুরেন্স সবার জন্য প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে যারা পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন। সঠিক সময়ে সঠিক ধরনের বিমা গ্রহণ করলে এটি শুধু ঝুঁকি কমায় না, বরং ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এখন জীবন বিমা, স্বাস্থ্য বিমা, যানবাহন বিমা এবং সম্পত্তি বিমার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কারণ মানুষ বুঝতে পারছে—বিমা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি বুদ্ধিমান আর্থিক পরিকল্পনার অংশ। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় জানবো ইন্স্যুরেন্স কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং কেন এটি আমাদের জীবনে এতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ইন্স্যুরেন্স বা বিমা কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইন্স্যুরেন্স বা বিমা হলো একটি আর্থিক চুক্তি, যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিমিয়ামের বিনিময়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা পায়। সহজভাবে বলতে গেলে, আপনি নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট টাকা বিমা কোম্পানিকে প্রদান করেন, আর বিনিময়ে তারা আপনার জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি হলে আর্থিক সহায়তা দেয়।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি জীবন বিমা করেছেন। যদি কোনো দুর্ঘটনায় তার অকাল মৃত্যু ঘটে, তাহলে বিমা কোম্পানি তার পরিবারকে নির্ধারিত অর্থ প্রদান করবে। এতে করে পরিবারটি হঠাৎ আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে না। ঠিক একইভাবে, স্বাস্থ্য বিমা অসুস্থতার সময় চিকিৎসা খরচ বহন করতে সাহায্য করে, যা আজকের দিনে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

ইন্স্যুরেন্সের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো—এটি ঝুঁকি ভাগাভাগি করে। একজন মানুষের পক্ষে বড় আর্থিক ক্ষতি একা বহন করা কঠিন হলেও, বহু মানুষের ছোট ছোট প্রিমিয়ামের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি সহজেই সামাল দেওয়া যায়। এই ব্যবস্থাই বিমাকে একটি কার্যকর ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সুরক্ষা পদ্ধতিতে পরিণত করেছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিমা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সাহায্য করে। বিশেষ করে জীবন বিমা অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে বিমার অর্থ পাওয়া যায়, যা সন্তানদের শিক্ষা, বিয়ে কিংবা অবসর জীবনের জন্য কাজে লাগে।

বর্তমান সময়ে চিকিৎসা ব্যয়, দুর্ঘটনা ও জীবনের অনিশ্চয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এই পরিস্থিতিতে বিমা ছাড়া জীবন পরিচালনা করা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তরুণ বয়স থেকেই বিমার গুরুত্ব বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিমা গ্রহণ করা অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ।

সবশেষে বলা যায়, ইন্স্যুরেন্স শুধু ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা দেয় না, এটি মানসিক প্রশান্তিও প্রদান করে। যখন আপনি জানেন যে কোনো বিপদে আপনার বা আপনার পরিবারের পাশে একটি আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে, তখন জীবনযাপন আরও নিশ্চিন্ত ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

ভুল–১: পলিসির শর্ত ও কভারেজ না বুঝে বিমা করা

বিমা করার সময় সবচেয়ে মারাত্মক ও সাধারণ ভুলগুলোর একটি হলো—পলিসির শর্ত, নিয়ম ও কভারেজ ভালোভাবে না বুঝে তাড়াহুড়ো করে বিমা করে ফেলা। অনেক মানুষ শুধুমাত্র এজেন্টের কথার ওপর ভরসা করে অথবা বিজ্ঞাপনের লোভনীয় ভাষা দেখে বিমা করে নেন, কিন্তু পলিসির ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো পড়ে দেখেন না। পরবর্তীতে যখন ক্লেইম করার সময় আসে, তখন দেখা যায় বাস্তব সুবিধা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।

প্রতিটি বিমা পলিসিতে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত থাকে—যেমন কোন পরিস্থিতিতে ক্লেইম করা যাবে, কোন ক্ষেত্রে ক্লেইম বাতিল হতে পারে, অপেক্ষাকাল (waiting period), এক্সক্লুশন (যেসব বিষয় কভার করা হবে না) ইত্যাদি। এগুলো না জেনে বিমা করলে ভবিষ্যতে বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিমার ক্ষেত্রে অনেক রোগ প্রথম কয়েক বছর কভার করা হয় না, যা অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো—অনেকেই কভারেজ অ্যামাউন্ট সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। ধরুন, কেউ জীবন বিমা করলেন ৫ লাখ টাকার, কিন্তু পরিবারের মাসিক খরচ ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজন অনুযায়ী তার দরকার ছিল কমপক্ষে ১৫–২০ লাখ টাকার কভারেজ। এই ভুল পরিকল্পনার ফলে বিমা থাকা সত্ত্বেও পরিবার আর্থিকভাবে নিরাপদ থাকে না।

এই ভুল এড়াতে হলে বিমা করার আগে অবশ্যই পলিসির ডকুমেন্ট ভালোভাবে পড়তে হবে। কভারেজ কী, কী অন্তর্ভুক্ত নয়, মেয়াদ কতদিন, প্রিমিয়াম কত বছর দিতে হবে—এই বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে একাধিক কোম্পানির পলিসি তুলনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

ভুল–২: শুধু কম প্রিমিয়ামের দিকে নজর দেওয়া

অনেক মানুষের ধারণা হলো—যে বিমার প্রিমিয়াম যত কম, সেটিই সবচেয়ে ভালো। বাস্তবে এই ধারণা প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়। কম প্রিমিয়ামের পলিসি সাধারণত কম কভারেজ, বেশি শর্ত এবং সীমিত সুবিধা নিয়ে আসে। ফলে বিমা থাকার পরও কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা পাওয়া যায় না।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি স্বাস্থ্য বিমা করতে গিয়ে কম প্রিমিয়ামের একটি পলিসি বেছে নিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল, সেই পলিসিতে হাসপাতাল ক্যাশলেস সুবিধা নেই, নির্দিষ্ট হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও চিকিৎসা করালে টাকা পাওয়া যাবে না, কিংবা বড় অপারেশনগুলো আংশিকভাবে কভার করা হয়। এই পরিস্থিতিতে কম প্রিমিয়ামের সুবিধা আর থাকে না।

জীবন বিমার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। অনেক সময় কম প্রিমিয়ামের কারণে বিমার অংক এতটাই কম হয় যে, দুর্ঘটনার পর পরিবার প্রকৃত আর্থিক সহায়তা পায় না। অথচ সামান্য বেশি প্রিমিয়াম দিলে অনেক বড় কভারেজ ও অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া সম্ভব ছিল।

কম প্রিমিয়াম দেখে বিমা করার আরেকটি ঝুঁকি হলো—ক্লেইম সেটেলমেন্ট রেশিও। অনেক সস্তা বিমা পলিসি দেওয়া কোম্পানির ক্লেইম পরিশোধের হার কম হয়। অর্থাৎ, ক্লেইম করার সময় নানান অজুহাতে টাকা দেওয়া হয় না। তাই শুধু দাম নয়, কোম্পানির সুনাম, গ্রাহক সেবা এবং ক্লেইম রেকর্ডও যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রিমিয়াম ও কভারেজের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে। নিজের আয়, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, ভবিষ্যৎ দায়িত্ব এবং ঝুঁকি বিবেচনা করে এমন একটি পলিসি বেছে নিতে হবে, যা বাস্তব প্রয়োজনে সত্যিকার সুরক্ষা দেবে।

সবশেষে বলা যায়, বিমা কখনোই শুধু খরচ কমানোর বিষয় নয়—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা। তাই কম প্রিমিয়ামের লোভে ভুল সিদ্ধান্ত না নিয়ে, সচেতনভাবে শর্ত ও সুবিধা বিশ্লেষণ করে বিমা করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

ভুল–৩: নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বিমা না নেওয়া

বিমা করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ও ক্ষতিকর ভুল হলো—নিজের বাস্তব প্রয়োজন বিশ্লেষণ না করে বিমা করা। অনেকেই দেখে অন্য কেউ কোন পলিসি নিয়েছে, অথবা বাজারে কোন বিমাটি বেশি জনপ্রিয়, সেই ভিত্তিতে একই ধরনের বিমা নিয়ে ফেলেন। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের আর্থিক অবস্থা, বয়স, পরিবারের দায়িত্ব এবং ঝুঁকি একরকম নয়। তাই এক জনের জন্য উপযোগী বিমা অন্য জনের জন্য কার্যকর নাও হতে পারে।

ধরা যাক, একজন অবিবাহিত তরুণ এবং একজন সংসারী ব্যক্তির বিমা চাহিদা কখনোই এক হবে না। অবিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিমা ও দুর্ঘটনা বিমা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সংসারী ব্যক্তির জন্য জীবন বিমার কভারেজ অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। নিজের এই পার্থক্য না বুঝে বিমা করলে ভবিষ্যতে বিমা থাকা সত্ত্বেও পরিবার আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কেউ খুব কম কভারেজের জীবন বিমা নিয়েছেন, অথচ তার ওপর পুরো পরিবারের দায়িত্ব নির্ভর করে। আবার কেউ অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত রাইডার বা সুবিধা যুক্ত পলিসি নিয়েছেন, যার বাস্তব প্রয়োজন তার জীবনে নেই। এর ফলে হয় প্রয়োজনের তুলনায় কম সুরক্ষা পাওয়া যায়, নয়তো অযথা বেশি প্রিমিয়াম দিতে হয়।

স্বাস্থ্য বিমার ক্ষেত্রেও এই ভুলটি মারাত্মক হতে পারে। বয়স, পূর্বের রোগ ইতিহাস, জীবনযাত্রা ও কাজের ধরন অনুযায়ী স্বাস্থ্য বিমার কভারেজ নির্বাচন করা জরুরি। কিন্তু অনেকেই এই বিষয়গুলো বিবেচনা না করেই একটি সাধারণ পলিসি নিয়ে নেন, যা ভবিষ্যতে বড় চিকিৎসা ব্যয়ের সময় যথেষ্ট সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়।

এই ভুল এড়াতে হলে প্রথমে নিজের প্রয়োজন পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। মাসিক আয়, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, নির্ভরশীল ব্যক্তি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে তারপর বিমার ধরন ও কভারেজ ঠিক করা উচিত। মনে রাখতে হবে, সঠিক বিমা মানেই সবচেয়ে দামি বা সবচেয়ে জনপ্রিয় পলিসি নয়—বরং যেটি আপনার জীবনের বাস্তব চাহিদা পূরণ করে।

ভুল–৪: এজেন্টের কথায় সম্পূর্ণ নির্ভর করা

বিমা করার সময় আরেকটি খুব সাধারণ কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ভুল হলো—এজেন্টের কথার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা। সত্যি বলতে, সব এজেন্ট খারাপ নন; অনেক এজেন্টই আন্তরিকভাবে গ্রাহকের উপকার করতে চান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ বিমা এজেন্ট কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করেন, ফলে অনেক সময় তারা এমন পলিসি সাজেস্ট করেন যা তাদের লাভ বেশি করে, গ্রাহকের প্রয়োজন নয়।

অনেক মানুষ এজেন্ট যা বলেন, সেটাকেই চূড়ান্ত সত্য ধরে নেন এবং পলিসির ডকুমেন্ট পড়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এজেন্ট যখন বলেন, “সবকিছু কভার করবে”, “ঝামেলা ছাড়াই টাকা পাওয়া যাবে”—এই কথাগুলো শুনে মানুষ আশ্বস্ত হয়ে যান। কিন্তু লিখিত শর্তে অনেক সীমাবদ্ধতা ও এক্সক্লুশন থাকে, যা পরে ক্লেইম করার সময় সামনে আসে।

আরেকটি সমস্যা হলো—কিছু এজেন্ট নির্দিষ্ট কোম্পানির পলিসিই বিক্রি করেন। ফলে বাজারে আরও ভালো অপশন থাকা সত্ত্বেও গ্রাহক সেগুলো সম্পর্কে জানতেই পারেন না। এতে করে গ্রাহক তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়াই একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়।

বিশেষ করে নতুন বিমা গ্রাহকরা এজেন্টের ওপর বেশি নির্ভর করেন, কারণ বিমার ভাষা ও শর্ত অনেকের কাছেই জটিল মনে হয়। এই সুযোগেই কিছু অসাধু এজেন্ট অপ্রয়োজনীয় রাইডার যোগ করেন, অথবা প্রিমিয়ামের প্রকৃত সময়কাল ও শর্ত স্পষ্ট করেন না।

এই ভুল এড়ানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো—নিজে সচেতন হওয়া। এজেন্টের কথা শোনার পাশাপাশি পলিসির ব্রোশার ও টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন নিজে পড়ে দেখা উচিত। প্রয়োজনে অনলাইন রিভিউ, কোম্পানির ক্লেইম সেটেলমেন্ট রেশিও এবং গ্রাহক অভিজ্ঞতা যাচাই করা দরকার।

মনে রাখতে হবে, এজেন্ট একজন পরামর্শদাতা হতে পারেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আপনারই হওয়া উচিত। নিজের প্রয়োজন, বাজেট ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে বিমা সত্যিকার অর্থেই একটি নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

ভুল–৫: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ও তথ্য গোপন করা

বিমা করার সময় সবচেয়ে মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ ভুলগুলোর একটি হলো—প্রয়োজনীয় তথ্য বা ডকুমেন্ট গোপন করা। অনেক মানুষ মনে করেন, কিছু তথ্য লুকালে প্রিমিয়াম কম হবে অথবা বিমা সহজে পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে এই চিন্তাভাবনাই ভবিষ্যতে ক্লেইম বাতিল হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে জীবন বিমা ও স্বাস্থ্য বিমার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বের রোগ ইতিহাস, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, ধূমপান বা মদ্যপানের অভ্যাস, বয়স, পেশা—এই তথ্যগুলো বিমা কোম্পানির ঝুঁকি মূল্যায়নের মূল ভিত্তি। এগুলোর কোনোটি গোপন করলে পলিসি কার্যকর থাকলেও ক্লেইমের সময় বড় সমস্যায় পড়তে হয়।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কেউ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের মতো সমস্যার কথা উল্লেখ না করেই স্বাস্থ্য বিমা করেন। প্রিমিয়াম হয়তো কিছুটা কম হয়, কিন্তু ভবিষ্যতে চিকিৎসা খরচের জন্য ক্লেইম করলে কোম্পানি সহজেই মেডিকেল রিপোর্ট যাচাই করে তথ্য গোপনের প্রমাণ বের করে ফেলে। তখন পুরো ক্লেইম বাতিল হয়ে যায়।

জীবন বিমার ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি থাকে। বয়স, পেশা বা শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ভুল তথ্য দিলে পলিসি আইনগতভাবে বাতিলযোগ্য হয়ে যায়। এমনকি বিমা গ্রহণের কয়েক বছর পর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও, তথ্য গোপনের প্রমাণ মিললে পরিবার কোনো অর্থ পায় না।

অনেকে মনে করেন, “এগুলো তো ছোট বিষয়”—কিন্তু বিমার দৃষ্টিতে ছোট কোনো তথ্যই নেই। বিমা একটি আইনি চুক্তি, যেখানে উভয় পক্ষের সততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তথ্য গোপন না করে সঠিক ও পূর্ণ তথ্য প্রদান করাই নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায়।

বিমা করার আগে যে বিষয়গুলো অবশ্যই যাচাই করবেন

সঠিক বিমা নির্বাচন করতে হলে শুধু এজেন্টের কথায় ভরসা না করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিজে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। এই যাচাইগুলো আপনাকে ভবিষ্যতের বড় আর্থিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।

প্রথমেই যাচাই করতে হবে বিমা কোম্পানির বিশ্বাসযোগ্যতা। কোম্পানিটি কত বছর ধরে ব্যবসা করছে, তাদের ক্লেইম সেটেলমেন্ট রেশিও কেমন, গ্রাহক সন্তুষ্টির রেকর্ড কেমন—এই তথ্যগুলো জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কোম্পানি সাধারণত স্বচ্ছ শর্ত ও সময়মতো ক্লেইম পরিশোধের জন্য পরিচিত।

এরপর পলিসির কভারেজ ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে। কী কী ঝুঁকি কভার করা হবে এবং কোন কোন বিষয় কভার করা হবে না—এই অংশটি বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। অনেক পলিসিতে নির্দিষ্ট রোগ, দুর্ঘটনা বা সময়সীমার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকে, যা আগে না জানলে পরে সমস্যার কারণ হয়।

প্রিমিয়াম ও মেয়াদ সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। প্রিমিয়াম কত বছর দিতে হবে, দেরি হলে কী জরিমানা আছে, মাঝপথে পলিসি বন্ধ করলে কী হবে—এই বিষয়গুলো যাচাই না করলে ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

রাইডার বা অতিরিক্ত সুবিধাগুলোও যাচাই করা দরকার। অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় রাইডার যোগ করে প্রিমিয়াম বাড়ানো হয়। সত্যিই প্রয়োজন আছে কি না, তা বিবেচনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ক্লেইম করার প্রক্রিয়া। ক্লেইম করতে কী কী ডকুমেন্ট লাগবে, কত সময় লাগতে পারে, অনলাইন ক্লেইম সুবিধা আছে কি না—এসব বিষয় আগেই জেনে রাখা উচিত। সহজ ও স্বচ্ছ ক্লেইম প্রক্রিয়াই একটি ভালো বিমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সবশেষে, পলিসির শর্তাবলি নিজে পড়ে বুঝে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে বুঝিয়ে নিন, কিন্তু না বুঝে কখনোই সই করবেন না। মনে রাখবেন, সঠিক যাচাই ছাড়া করা বিমা নিরাপত্তা নয়—বরং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়।

সঠিক ইন্স্যুরেন্স বাছাই করার সহজ কৌশল

বর্তমান সময়ে ইন্স্যুরেন্স বা বিমা শুধু একটি আর্থিক সুরক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু বাজারে অসংখ্য বিমা পলিসি ও কোম্পানি থাকার কারণে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। সঠিক ইন্স্যুরেন্স বাছাই করতে হলে কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করা জরুরি।

প্রথম কৌশল হলো নিজের প্রয়োজন স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। আপনি কি জীবন বিমা চান, নাকি স্বাস্থ্য বিমা, নাকি দুটোই? আপনার বয়স, পারিবারিক দায়িত্ব, আয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করেই ইন্স্যুরেন্স নির্বাচন করা উচিত। অন্যের দেখে বা প্রলোভনে পড়ে পলিসি নিলে সেটি আপনার জন্য কার্যকর নাও হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, একাধিক কোম্পানির পলিসি তুলনা করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু প্রিমিয়াম কম দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কভারেজ, মেয়াদ, শর্তাবলি, ক্লেইম সুবিধা এবং অতিরিক্ত চার্জ—সবকিছু মিলিয়ে তুলনা করলে প্রকৃত ভ্যালু বোঝা যায়।

তৃতীয় কৌশল হলো ক্লেইম সেটেলমেন্ট রেশিও যাচাই করা। যে কোম্পানির ক্লেইম নিষ্পত্তির হার বেশি, তারা সাধারণত গ্রাহকদের দাবির প্রতি বেশি দায়িত্বশীল হয়। এই তথ্য অনলাইনে সহজেই পাওয়া যায় এবং এটি একটি নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

চতুর্থত, পলিসির শর্ত ও এক্সক্লুশন অংশ ভালোভাবে পড়া প্রয়োজন। কোন পরিস্থিতিতে ক্লেইম দেওয়া যাবে না, কত সময় পর কভারেজ কার্যকর হবে—এই বিষয়গুলো না জানলে ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

সবশেষে, কখনোই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেবেন না। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত কারো পরামর্শ নিন, নিজে সময় নিয়ে বুঝে তারপর ইন্স্যুরেন্স নির্বাচন করুন। সঠিক সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে আপনাকে মানসিক ও আর্থিক স্বস্তি দেবে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)

প্রশ্ন ১: জীবন বিমা ও স্বাস্থ্য বিমার মধ্যে কোনটি বেশি জরুরি?
উত্তর: দুটোই গুরুত্বপূর্ণ, তবে পরিবার ও আয়ের ওপর নির্ভর করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা উচিত। আয়ের একমাত্র উৎস হলে জীবন বিমা আগে নেওয়া ভালো।

প্রশ্ন ২: কম প্রিমিয়ামের পলিসি কি সবসময় ভালো?
উত্তর: না। কম প্রিমিয়ামের পেছনে অনেক সময় সীমিত কভারেজ বা কঠিন শর্ত থাকে। তাই কভারেজ ও সুবিধা আগে যাচাই করা জরুরি।

প্রশ্ন ৩: অনলাইনে ইন্স্যুরেন্স নেওয়া কি নিরাপদ?
উত্তর: হ্যাঁ, নির্ভরযোগ্য কোম্পানি ও অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ব্যবহার করলে অনলাইন ইন্স্যুরেন্স সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী।

প্রশ্ন ৪: ইন্স্যুরেন্স নেওয়ার সেরা বয়স কোনটি?
উত্তর: যত কম বয়সে নেওয়া যায়, তত ভালো। কম বয়সে প্রিমিয়াম কম হয় এবং কভারেজ সুবিধা বেশি পাওয়া যায়।

প্রশ্ন ৫: পলিসি মাঝপথে বন্ধ করলে কি ক্ষতি হয়?
উত্তর: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়। অনেক পলিসিতে নির্দিষ্ট সময়ের আগে বন্ধ করলে আর্থিক ক্ষতি ও বেনিফিট হারানোর ঝুঁকি থাকে।

উপসংহার

ইন্স্যুরেন্স কোনো বিলাসিতা নয়, বরং জীবনের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে একটি শক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত ছাড়া নেওয়া বিমা ভবিষ্যতে উপকারের বদলে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আবেগ বা প্রলোভনের ভিত্তিতে নয়, বরং সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

নিজের প্রয়োজন বোঝা, পলিসি তুলনা করা, শর্তাবলি যাচাই করা এবং বিশ্বাসযোগ্য কোম্পানি নির্বাচন—এই চারটি বিষয় মাথায় রাখলে সঠিক ইন্স্যুরেন্স বাছাই করা অনেক সহজ হয়ে যায়। মনে রাখবেন, আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই আগামী দিনের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

সবশেষে বলা যায়, ইন্স্যুরেন্স এমন একটি বিনিয়োগ যা শুধু অর্থ নয়, বরং মানসিক শান্তিও দেয়। তাই সময় নিয়ে, বুঝে-শুনে এবং সঠিক কৌশল অনুসরণ করে ইন্স্যুরেন্স নিন—নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪