সাইবার নিরাপত্তা (Security) আপনার স্মার্টফোন হ্যাক হওয়া থেকে বাঁচান: ৭টি সহজ কৌশল।
আপনার স্মার্টফোন কি সত্যিই নিরাপদ? আজকের ডিজিটাল যুগে হ্যাকিং, ডেটা চুরি ও প্রাইভেসি লঙ্ঘনের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই পোস্টে আমরা ৭টি সহজ ও কার্যকর কৌশল দেখাবো, যা আপনাকে সাইবার হামলা থেকে রক্ষা করবে এবং আপনার ব্যক্তিগত তথ্যকে নিরাপদ রাখবে। নিচের টিপসগুলো অনুসরণ করলে আপনি অনলাইন এবং অফলাইনে উভয় ক্ষেত্রেই সুরক্ষিত থাকতে পারবেন।
ভূমিকা: কেন স্মার্টফোন হ্যাকিং আজ বেশি ভয়ানক
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ। যোগাযোগ, ফেসবুক, ব্যাংকিং, অনলাইন পেমেন্ট, ছবি—সব কিছুই আমরা এখন মোবাইলে সংরক্ষণ করি। আর ঠিক এই কারণেই স্মার্টফোন হ্যাকিং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। একজন হ্যাকার যদি আপনার ফোনে প্রবেশ করতে পারে, তাহলে সে শুধু আপনার ব্যক্তিগত ছবি বা মেসেজই দেখতে পারবে না; বরং আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এমনকি ব্যক্তিগত পরিচয় পর্যন্ত চুরি হয়ে যেতে পারে।
বেশিরভাগ মানুষ ভাবে — “আমার ফোনে তো তেমন কিছুই নেই…” কিন্তু বাস্তবে আপনার ফোনে থাকা সাধারণ তথ্যও হ্যাকারদের জন্য যথেষ্ট। আপনার কন্টাক্ট লিস্ট, OTP, ইমেল, পাসওয়ার্ড অটো-সেভ, গ্যালারির ছবি—সবই সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু। এছাড়া, এখনকার হ্যাকিং কৌশলগুলো অনেক উন্নত এবং অটোমেটেড। এক ক্লিকের একটি ক্ষতিকর লিংক বা অজানা অ্যাপ থেকেই পুরো ফোন আক্রান্ত হতে পারে।
যেহেতু স্মার্টফোন এখন আমাদের “ডিজিটাল জীবন”—তাই এটি সুরক্ষিত রাখা খুবই জরুরি। আর এ কারণেই সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়া, ঝুঁকিগুলো জানা এবং কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলা আমাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও স্ক্রিন লক ব্যবহার করুন
আপনার স্মার্টফোনকে হ্যাকিং থেকে সুরক্ষিত রাখার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড বা স্ক্রিন লক ব্যবহার করা। অনেকেই এখনো সহজ পিন যেমন 1234, 0000 বা জন্মতারিখ ব্যবহার করেন, যা হ্যাকারদের জন্য অনুমান করা খুব সহজ। তাই পাসওয়ার্ড এমন হতে হবে যাতে অক্ষর, সংখ্যা ও বিশেষ চিহ্নের সমন্বয় থাকে।
স্ক্রিন লক হিসেবে প্যাটার্ন, পিন, পাসওয়ার্ড বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট— আপনার ডিভাইসের নিরাপত্তা অনুযায়ী সঠিক অপশন বেছে নিন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি ৬–৮ ডিজিটের পিন বা শক্তিশালী অক্ষর-সংখ্যা সমন্বিত পাসওয়ার্ড অনেক বেশি নিরাপদ। এছাড়া কিছু সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যাওয়ার সেটিং অন করে রাখলে কেউ আপনার অজান্তেই ফোন ব্যবহার করতে পারবে না।
২. দুই ধাপ যাচাইকরণ (2FA) চালু রাখুন
আপনার স্মার্টফোন বা অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো দুর্বল লগইন সুরক্ষা। দুই ধাপ যাচাইকরণ (2FA) চালু করলে হ্যাকারের পক্ষে আপনার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। কারণ এটি লগইনের জন্য আপনার পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি একটি আলাদা কোড বা ভেরিফিকেশন দরকার হয়, যা সাধারণত আপনার ফোনে এসএমএস/ইমেইল বা অথেন্টিকেটর অ্যাপে আসে।
2FA সক্রিয় থাকলে হ্যাকার আপনার পাসওয়ার্ড জানলেও অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারবে না, কারণ দ্বিতীয় ধাপের কোড ছাড়া লগইন সম্পূর্ণ হয় না। তাই আপনার গুগল, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ব্যাংকিং অ্যাপসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল অ্যাকাউন্টে 2FA সক্রিয় করে রাখুন। এটি আপনার ডিজিটাল নিরাপত্তাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৩. অজানা অ্যাপ ও লিংক এড়িয়ে চলুন
স্মার্টফোন হ্যাকিংয়ের অন্যতম বড় কারণ হলো অজানা উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা বা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা। হ্যাকাররা সাধারণত ক্ষতিকর অ্যাপ বা লিংকের মাধ্যমে আপনার ফোনে ম্যালওয়্যার, স্পাইওয়্যার বা ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া, ফ্রি গিফট, অফার বা রিওয়ার্ডস সংক্রান্ত লিংকগুলোতে ঝুঁকি বেশি থাকে।
সুতরাং গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে অ্যাপ ইন্সটল করবেন না। কোনো লিংক অস্বাভাবিক মনে হলে বা অপরিচিত কারো পাঠানো হলে সেটিতে ক্লিক না করাই ভালো। ইমেইল, মেসেঞ্জার, এসএমএস বা ওয়েবসাইটের অজানা লিংকে ক্লিক করার আগে নিশ্চিত হোন সেটি নিরাপদ কিনা।
অজানা লিংক ও অ্যাপ থেকে দূরে থাকলে আপনার ফোনের সাইবার নিরাপত্তা অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকবে এবং হ্যাকিং সম্ভাবনা কমে যাবে।
৪. সফটওয়্যার আপডেট নিয়মিত দিন
স্মার্টফোন সাইবার নিরাপত্তা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর এবং সহজ একটি উপায় হলো নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট দেওয়া। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে আপডেট মানেই শুধু নতুন ডিজাইন বা কিছু অতিরিক্ত ফিচার, কিন্তু বাস্তবে আপডেটের মূল উদ্দেশ্য হলো সিকিউরিটি উন্নত করা। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে নতুন ধরনের ম্যালওয়্যার, ভাইরাস ও সাইবার আক্রমণের পদ্ধতিও তৈরি হচ্ছে। এই ঝুঁকি মোকাবেলায় ফোন নির্মাতা কোম্পানিগুলো সিকিউরিটি প্যাচ ও সিস্টেম আপডেট প্রদান করে থাকে।
ফোন আপডেট না দিলে পুরোনো সফটওয়্যারের দুর্বলতা (vulnerability) হ্যাকারদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। তারা এসব দুর্বলতা ব্যবহার করে সহজেই ফোনে ঢুকে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং ডেটা–সবকিছু চুরি করতে পারে। শুধুমাত্র একটি ছোট সফটওয়্যার লুপহোল আপনার পুরো ফোনকে হ্যাকিংয়ের ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।
সিস্টেম আপডেট ছাড়াও অ্যাপ আপডেট করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অ্যাপ ডেভেলপাররা তাদের অ্যাপে পাওয়া বাগ বা সিকিউরিটি সমস্যার সমাধান আপডেটের মাধ্যমে দেয়। তাই প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোরে গিয়ে অটো আপডেট চালু রাখা নিরাপদ ব্যবহারের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত।
আপডেট দেওয়ার সময় অবশ্যই বিশ্বস্ত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করবেন এবং ফোনে পর্যাপ্ত চার্জ আছে কি না তা নিশ্চিত করবেন। এতে আপডেট সঠিকভাবে ইনস্টল হবে এবং ফোনের স্থায়িত্বও বজায় থাকবে।
সফটওয়্যার আপডেট নিয়মিত দিলে ফোন শুধু দ্রুত ও স্মুথ হয় না, বরং সাইবার হ্যাকিংয়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপডেটের নোটিফিকেশন দেখলেই দেরি না করে ইনস্টল করে নিন।
৫. পাবলিক Wi-Fi ব্যবহার করার সময় সতর্ক থাকুন
পাবলিক Wi-Fi আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকেরই নির্ভরতার জায়গা—কফি শপ, রেস্টুরেন্ট, পার্ক বা লাইব্রেরিতে বসে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে বেশ সুবিধা হয়। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে থাকে বড় ধরনের সাইবার ঝুঁকি। হ্যাকাররা খুব সহজে উন্মুক্ত বা কম সুরক্ষিত Wi-Fi নেটওয়ার্কে ফাঁদ পেতে বসে থাকে, আর কেউ সংযোগ করলেই তারা ব্যক্তিগত তথ্য, ব্রাউজিং ডেটা এমনকি লগইন পাসওয়ার্ড পর্যন্ত চুরি করতে পারে।
পাবলিক নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হলে আপনার ফোনের ডেটা এনক্রিপ্টেড না থাকলে হ্যাকাররা সেটি ধরে ফেলতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংকিং অ্যাপ, ই-ওয়ালেট, ইমেইল, সোশ্যাল মিডিয়া বা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে লগইন করলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অনেক সময় হ্যাকাররা আসল Wi-Fi এর নামের সঙ্গে মিল রেখে ভুয়া নেটওয়ার্ক তৈরি করে। ব্যবহারকারী ভুল করে সেই নেটওয়ার্কে লগইন করলেই পুরো ডিভাইস তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাবলিক Wi-Fi ব্যবহারের সময় কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত, পাবলিক নেটওয়ার্কে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা গোপন কাজ করবেন না। প্রয়োজন হলে মোবাইল ডাটা ব্যবহার করাই উত্তম। দ্বিতীয়ত, ফোনের অটো-Connect ফিচার বন্ধ রাখুন যাতে অজান্তেই কোনো অজানা নেটওয়ার্কে সংযুক্ত না হয়ে যায়। তৃতীয়ত, ওয়েবসাইট ব্রাউজ করার সময় অবশ্যই HTTPS সমর্থিত সাইট ব্যবহার করুন, কারণ এতে ডেটা এনক্রিপ্টেড থাকে।
আরও নিরাপদ থাকতে চাইলে VPN ব্যবহার করা একটি বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত। VPN আপনার ডেটা এনক্রিপ্ট করে পাঠায়, ফলে হ্যাকাররা মাঝপথে ডেটা ধরতে পারে না। তবে অবশ্যই বিশ্বস্ত VPN অ্যাপ ব্যবহার করা জরুরি।
সামান্য অসতর্কতা আপনার পুরো ফোনকে হ্যাকিংয়ের ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। তাই পাবলিক Wi-Fi ব্যবহার করার সময় সবসময় সতর্ক থাকুন এবং প্রয়োজন ছাড়া এই ধরনের নেটওয়ার্কে কোনো সংবেদনশীল কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন না।
৬. অ্যান্টিভাইরাস ও সিকিউরিটি অ্যাপ ব্যবহার করুন
বর্তমানে স্মার্টফোন হ্যাকিং, ম্যালওয়্যার, স্পাইওয়্যার ও ফিশিং আক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে অ্যান্টিভাইরাস ও সিকিউরিটি অ্যাপ ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। অনেকেই ভুলভাবে মনে করেন যে অ্যান্টিভাইরাস শুধুমাত্র কম্পিউটারের জন্য প্রয়োজন, কিন্তু বাস্তবে স্মার্টফোনও একই ধরনের সাইবার ঝুঁকির মুখে থাকে। বিশেষ করে অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে অজানা অ্যাপ, ক্ষতিকর লিংক ও থার্ড-পার্টি ফাইল ডাউনলোডের কারণে ম্যালওয়্যার খুব সহজেই ফোনে ঢুকে যেতে পারে।
বিশ্বস্ত অ্যান্টিভাইরাস অ্যাপ ব্যবহার করলে আপনার ফোন রিয়েল-টাইম সিকিউরিটি পায়। এই অ্যাপগুলো ফোনে ইনস্টল করা প্রতিটি অ্যাপ স্ক্যান করে দেখে কোনো ক্ষতিকর কোড আছে কি না। তাছাড়া ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা সন্দেহজনক অ্যাক্টিভিটি, অস্বাভাবিক ডেটা ব্যবহার, বা হ্যাকিং চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিকভাবে আপনাকে সতর্ক করে। কিছু সিকিউরিটি অ্যাপে ফিশিং ডিটেকশন, অ্যাপ লক, ওয়াই-ফাই সেফটি চেক, ব্রাউজার প্রটেকশন এবং চুরি প্রতিরোধের সুবিধাও পাওয়া যায়।
অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল করার ক্ষেত্রে নিশ্চিত হতে হবে যে অ্যাপটি বিশ্বস্ত ডেভেলপার বা পরিচিত ব্র্যান্ডের। অনেক ভুয়া অ্যান্টিভাইরাস নিজেরাই ম্যালওয়্যার ছড়ানোর কাজ করে, তাই গুগল প্লে স্টোর ছাড়া অন্য কোথাও থেকে এই ধরনের অ্যাপ ডাউনলোড করা উচিত নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল করলেই কাজ শেষ নয়; এটি নিয়মিত আপডেট করতে হবে। কারণ হ্যাকাররা প্রতিদিন নতুন ধরনের ভাইরাস তৈরি করছে, আর আপডেটেড সিকিউরিটি ডাটাবেইস ছাড়া অ্যাপগুলো সেই নতুন ভাইরাস শনাক্ত করতে পারবে না।
স্মার্টফোনে অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার শুধু নিরাপত্তা বাড়ায় না, বরং ফোনের পারফরম্যান্সও অনেক ক্ষেত্রে উন্নত করে। ক্ষতিকর অ্যাপ ও ম্যালওয়্যার সরিয়ে ডিভাইসকে দ্রুত ও নিরাপদ রাখে। তাই ফোনকে হ্যাকিং থেকে রক্ষা করতে অ্যান্টিভাইরাস বা সিকিউরিটি অ্যাপ ব্যবহার একটি অত্যাবশ্যকীয় পদক্ষেপ।
৭. অ্যাপ পারমিশন ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করুন
স্মার্টফোনে থাকা যেকোনো অ্যাপ কাজ করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট পারমিশন (Permission) চায়—যেমন ক্যামেরা, লোকেশন, কন্ট্যাক্ট, মাইক্রোফোন বা স্টোরেজে অ্যাক্সেস। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক অ্যাপ প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত পারমিশন চেয়ে থাকে। এই অতিরিক্ত অনুমতিগুলোই হ্যাকার বা ম্যালওয়্যারকে সুযোগ দেয় আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে বা ফোনের ভেতরের ডেটা মনিটর করতে।
সুতরাং নিরাপদ থাকতে অ্যাপ ইনস্টল করার পরই তার পারমিশনগুলো ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। যে অ্যাপটি শুধু ছবি এডিট করবে, তার মাইক্রোফোন বা লোকেশন অ্যাক্সেসের প্রয়োজন নেই। আবার একটি টর্চ অ্যাপ কখনোই আপনার কন্ট্যাক্ট বা ক্যামেরায় অনুমতি চাইতে পারে না—এটা সন্দেহজনক।
আধুনিক অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে অ্যাপ পারমিশন নিয়ন্ত্রণের ভালো সিস্টেম রয়েছে। আপনি চাইলে যেকোনো সময় ‘Allow’, ‘Deny’, বা ‘Allow only while using the app’ অপশন বেছে নিতে পারেন। প্রতিটি পারমিশন নিয়ন্ত্রণ করলে অ্যাপগুলো আপনার ডেটায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে হাত দিতে পারে না, ফলে হ্যাকিংয়ের সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
মনে রাখবেন—ফোনে থাকা অ্যাপের সংখ্যা যত কম হবে, নিরাপত্তাও তত বেশি থাকবে। তাই অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ নিয়মিত আনইনস্টল করে দিন এবং যেসব অ্যাপ দীর্ঘদিন ব্যবহার করেন না তাদের পারমিশনও বন্ধ রাখুন।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: অ্যাপ পারমিশন চেক করার সবচেয়ে সহজ উপায় কী?
উত্তর: আপনার ফোনের “Settings → Apps → App Permissions” গিয়ে প্রতিটি ক্যাটাগরিতে কোন অ্যাপ কী অনুমতি পেয়েছে তা দেখে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
প্রশ্ন ২: সব অ্যাপের পারমিশন কি বন্ধ করে দেওয়া উচিত?
উত্তর: না, যেসব অ্যাপ সত্যিকার অর্থে পারমিশন ছাড়া কাজ করতে পারে না—যেমন ক্যামেরা অ্যাপ, ম্যাপস, কলিং অ্যাপ—সেগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমতি দিতে হবে। তবে অপ্রয়োজনীয় পারমিশন অবশ্যই বন্ধ রাখা উচিত।
প্রশ্ন ৩: পারমিশন ভুলভাবে দিলে কি ফোন হ্যাক হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, বিশেষ করে মাইক্রোফোন, ক্যামেরা, এসএমএস, স্টোরেজ বা লোকেশন পারমিশন অজানা অ্যাপকে দিলে ফোন সহজেই ম্যালওয়্যার বা স্পাই অ্যাপ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।
প্রশ্ন ৪: কোন কোন পারমিশন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ?
উত্তর: লোকেশন, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, কন্ট্যাক্ট, এসএমএস এবং স্টোরেজ অ্যাক্সেস — এগুলো হ্যাকিংয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, তাই বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রশ্ন ৫: পারমিশন নিয়ন্ত্রণ করলে কি ফোনের পারফরম্যান্স বাড়ে?
উত্তর: হ্যাঁ, অপ্রয়োজনীয় পারমিশন বন্ধ থাকলে অ্যাপগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে কম কাজ করে, ফলে ব্যাটারি ও ডেটা সেভ হয় এবং ফোনও দ্রুত কাজ করে।
উপসংহার: নিজের ফোন সুরক্ষায় সচেতন হোন
আজকের যুগে স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, আর্থিক তথ্য, সামাজিক যোগাযোগ, ছবি, ভিডিও এবং গুরুত্বপূর্ণ সব ডেটার ভান্ডার। তাই ফোন হ্যাক হওয়া মানে শুধু ডেটা হারানো নয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল পরিচয়—সবকিছুর উপরই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়া। কিন্তু সুখবর হলো—মাত্র কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুললে আপনি খুব সহজেই ফোনকে অধিকাংশ সাইবার আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন।
শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, নিয়মিত আপডেট দেওয়া, নিরাপদ Wi-Fi ব্যবহার, অজানা অ্যাপ বা লিংক এড়ানো, ২-ধাপ যাচাইকরণ চালু রাখা এবং অ্যাপ পারমিশন নিয়ন্ত্রণ—এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই আপনাকে বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে সক্ষম। বিশেষ করে আজকের দিনে হ্যাকাররা বিভিন্ন স্মিশিং, ফিশিং, স্পাই অ্যাপ, ম্যালওয়্যার ও ভুয়া লিংকের মাধ্যমে সহজেই ফোনে ঢুকে পড়তে পারে। তাই প্রতিটি ক্লিকের ক্ষেত্রে সচেতন থাকা এবং কোন অ্যাপকে কী অনুমতি দিচ্ছেন তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
অতএব, আপনার ফোনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত কাজ নয়—it is a daily habit. প্রতিদিন একটু সচেতনতা, সামান্য সতর্কতা এবং কয়েকটি নিয়ম মানলে আপনি সহজেই নিজের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ব্যাংকিং ডেটা, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট এবং ডিজিটাল পরিচয় নিরাপদ রাখতে পারবেন। হ্যাকিং রুখে দিতে বাহ্যিক নিরাপত্তার চেয়ে আপনার নিজের সচেতনতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
সবচেয়ে বড় কথা—আপনার ফোন আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত, হ্যাকারদের নয়। তাই আজ থেকেই নিরাপত্তার নিয়মগুলো অনুসরণ করুন এবং সাইবার ঝুঁকি থেকে নিজেকে ও আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন।


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url