শুক্রবারের দিন বাবা-মায়ের প্রতি সেবা এবং দান করার বিশেষ ফযিলত
শুক্রবার এক বিশেষ বরকতের দিন—এই দিনে বাবা-মায়ের প্রতি সেবা ও দান করলে সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একটি ছোট্ট উপহার, আন্তরিক দোয়া বা খানি-খানি সময়ই তাদের জন্য বড় সৌভাগ্যের কারণ হতে পারে। এই পোস্টে জেনে নিন কিভাবে শুক্রবারকে করে তুলবেন বাবা-মায়ের জন্য আরও বেশি বরকতময় ও স্মরণীয়।
1. শুক্রবারের দিন বাবা-মাকে সেবা করার গুরুত্ব
শুক্রবার ইসলামের কাছে একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিন। এই দিনে আল্লাহর রহমত, বরকত এবং নাজাতের দরজা অধিক খোলা থাকে। তাই এই দিনের আমলগুলোও অন্য দিনের তুলনায় বেশি ফজিলতপূর্ণ। বাবা-মা মানুষের দুনিয়ার সবচেয়ে নিকটতম অভিভাবক, যাদের সন্তুষ্টি অর্জন করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম উপায়। তাই শুক্রবারের মতো মুবারক দিনে বাবা-মাকে সেবা করা, তাদের পাশে সময় কাটানো, তাদের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করা এবং ভালো ব্যবহার করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
ইসলাম বাবা-মায়ের প্রতি উত্তম ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করেছে। কুরআনে আল্লাহ বার বার “আমার ইবাদত কর এবং বাবা-মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার কর”—এই নির্দেশ দিয়েছেন। তাই শুক্রবারের দিনে তাদের খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজন পূরণ করা, চিকিৎসা বা ওষুধের ব্যবস্থা করা, ঘরের কাজ সাহায্য করা, অথবা শুধু একটু স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে পাশে থাকা—এসব কাজ আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়। কারণ এই দিন দোয়া কবুলের অন্যতম সময় রয়েছে, ফলে বাবা-মায়ের সন্তুষ্টি লাভ করলে সেই দোয়াও আল্লাহর দরবারে দ্রুত গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
এছাড়া হাদিসে উল্লেখ আছে যে বাবা-মা সন্তুষ্ট হলে আল্লাহও সন্তুষ্ট হন। তাই শুক্রবারে তাদের সেবা করা শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং ইমানি করণীয়ও বটে। এ দিনে বাবা-মায়ের সাথে সদাচরণ করলে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করা যায়। যারা বাবা-মাকে জীবিত অবস্থায় সেবা করে, শুক্রবার তাদের জন্য সর্বোত্তম দিন হিসেবে গণ্য হয়, কারণ এ দিনের প্রতিটি সৎ আমলের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়।
2. বাবা-মাকে দান করার বিশেষ ফযিলত
ইসলামে দান-সদকা অত্যন্ত উত্তম ও বরকতময় একটি আমল। কিন্তু যখন দানটি বাবা-মায়ের প্রতি করা হয়, তখন তার ফযিলত আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বাবা-মা সন্তানের প্রথম পরিচর্যাকারী, লালন-পালনকারী এবং জীবনের প্রতিটি ধাপে সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকারকারী। তাই তাদের প্রতি দান করা শুধু সদকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায় হিসেবে গণ্য হয়।
অনেক সময় বাবা-মা সন্তানের কাছ থেকে কিছু বলেন না, কিন্তু তাদের নানান প্রয়োজন, চিকিৎসা ব্যয়, দৈনন্দিন চাহিদা বা মনোভার থাকে। শুক্রবারের মতো বরকতময় দিনে বাবা-মাকে আর্থিক সাহায্য বা উপহার দেওয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়। কারণ শুক্রবার এমন একটি দিন যেখানে নেক আমলের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়। ফলে এই দিনে বাবা-মাকে দান করলে তা সাধারণ দানের চেয়ে অধিক মর্যাদা পায়।
হাদিসে এসেছে, সবচেয়ে উত্তম দান হলো সেই দান যা মানুষ তার পরিবার-পরিজনের উপর করে। আর বাবা-মা পরিবারে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। তাই তাদের প্রতি দান করলে শুধু দুনিয়ার সচ্ছলতা বৃদ্ধি পায় না, বরং আখিরাতেও বড় প্রতিদান লাভ হয়। বিশেষ করে শুক্রবার তাদের জন্য ভালো খাবার, পোশাক, ওষুধ, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দেওয়া বা সামান্য আর্থিক সহায়তা করাও বিশাল সওয়াবের দরজা খুলে দেয়।
এছাড়া বাবা-মা সন্তুষ্ট হলে তাদের মুখ থেকে সন্তানের জন্য যে দোয়া বের হয়, তা আল্লাহ দ্রুত কবুল করেন। ফলে শুক্রবারে তাদের প্রতি দান করা দ্বিগুণ কল্যাণের উৎস—একদিকে সদকা, অন্যদিকে দোয়ার বরকত। তাই এ দিনে বাবা-মাকে দান করা একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পুরস্কারপূর্ণ একটি ইবাদত।
3. কুরআন-হাদিসে বাবা-মায়ের অধিকার ও শুক্রবারের ফজিলত
কুরআন ও হাদিসে বারবার বাবা-মায়ের মর্যাদা, অধিকার এবং তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্বের কথা গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বহু স্থানে নিজের ইবাদতের সাথে সাথে বাবা-মায়ের প্রতি উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন সূরা আল-ইসরায় আল্লাহ বলেন— “তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।” এই আয়াতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, আল্লাহ নিজের ইবাদতের সাথেই বাবা-মায়ের সেবা, সম্মান এবং ভালো ব্যবহারের গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
হাদিসেও বাবা-মায়ের অধিকার সম্পর্কে অসংখ্য নির্দেশনা পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর সন্তুষ্টি বাবা-মায়ের সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি বাবা-মায়ের অসন্তুষ্টিতে।” অর্থাৎ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো, তাদের খুশি রাখা ও তাদের প্রয়োজন পূরণ করা শুধু মানবিক দায়িত্বই নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথ।
শুক্রবারের দিনটি ইসলামে সাপ্তাহিক ঈদের মর্যাদা পাওয়া একটি বরকতময় দিন। এই দিনে নেক আমল, দান-সদকা, দোয়া এবং ইবাদতের সওয়াব অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি বৃদ্ধি করা হয়। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের প্রতি সদয় হওয়া, বাবা-মায়ের সেবা করা এবং তাদের মন রক্ষা করা শুক্রবারে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। কারণ রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মানুষের জীবনে ব্যস্ততা থাকে, আর শুক্রবার সেই ব্যস্ততার মাঝেও ইবাদত ও পরিবারের জন্য সময় দেওয়ার সুযোগ এনে দেয়।
হাদিসে এসেছে, শুক্রবারে একটি বিশেষ মুহূর্ত থাকে যেখানে বান্দার দোয়া আল্লাহ অবশ্যই কবুল করেন। বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করা, তাদের সুস্থতা ও কল্যাণ কামনা করা এবং তাদের খুশি করার বিভিন্ন কাজ—এই বিশেষ মুহূর্তে আল্লাহর দরবারে দ্রুত কবুল হয়। তাই কুরআন-হাদিসে উল্লেখিত বাবা-মায়ের অধিকার পালনের পাশাপাশি শুক্রবারের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয় এই দানের ও সেবার আমলগুলো।
সুতরাং, কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী বাবা-মায়ের অধিকার শুধু সাধারণ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বরকতময় শুক্রবারে তাদের প্রতি সেবা, দান ও ভালোবাসা প্রকাশ করলে তা বহুগুণ বেশি সওয়াবযুক্ত এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উত্কৃষ্ট উপায়।
4. শুক্রবারে বাবা-মাকে সেবা করার করণীয়
ইসলামে বাবা-মায়ের সেবা করা প্রতিটি সন্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, আর শুক্রবারের দিন এই সেবার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। শুক্রবার বরকতময় দিন হওয়ার কারণে এদিন বাবা-মাকে সময় দেওয়া, তাদের আরাম-আয়েশের খোঁজ নেওয়া এবং বিভিন্ন কাজ করে সাহায্য করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল। এদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই বাবা-মায়ের সালাম নেওয়া, তাদের জন্য নাশতা তৈরি করা বা খাবার এনে দেওয়া, ঘরের প্রয়োজনীয় কাজগুলোতে সাহায্য করা—এসব কাজ সন্তানের কর্তব্য এবং নেক আমল হিসেবেই গণ্য হয়।
এছাড়া যেসব বাবা-মা অসুস্থ বা দুর্বল, তাদের ওষুধ, চিকিৎসা বা চলাফেরায় সাহায্য করা শুক্রবারের সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক সময় বাবা-মা তাদের প্রয়োজন বা ইচ্ছা সরাসরি বলেন না। তাই তাদের মন বুঝে কাজ করা, হাঁটতে নিয়ে যাওয়া, কিছুক্ষণ তাদের সঙ্গে গল্প করা, তাদের সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা—এসব মানবিক ও ইসলামী দায়িত্ব পূরণ করে। শুক্রবারে দোয়া কবুলের সময় থাকে, তাই এই দিনে বাবা-মায়ের জন্য বিশেষ দোয়া করা উচিত। তাদের জন্য ক্ষমা, সুস্থতা ও বরকতের দোয়া করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পথ।
শুক্রবারে বাবা-মায়ের সেবা শুধু শারীরিক কাজেই সীমাবদ্ধ নয়; মানসিক শান্তি, ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শনও এই সেবার অন্তর্ভুক্ত। তাই এদিন তাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সময় কাটানো, রাগ না করা, তাদের কথা ধৈর্যের সঙ্গে শোনা এবং মন থেকে সম্মান দেখানো একজন সন্তানের সর্বোত্তম আচরণ হতে পারে। সামগ্রিকভাবে, শুক্রবার বাবা-মায়ের সেবার মাধ্যমে নিজের আমলকে আরও উন্নত করা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ।
5. বাবা-মাকে দান বা উপহার দেওয়ার নিয়ম
বাবা-মাকে দান বা উপহার দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। বিশেষ করে শুক্রবারের দিন তাদের প্রতি দান-উপহার প্রদানের সওয়াব আরও বেশি বৃদ্ধি পায়। বাবা-মাকে দান করার নিয়ম মূলত সহজ ও স্বাভাবিক—তাদের চাহিদা, আর্থিক অবস্থা এবং স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ভালোবাসার সঙ্গে কিছু প্রদান করাই মূল উদ্দেশ্য। দানের পরিমাণ ছোট বা বড় হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; একটি ফল, একটি পোশাক, কিছু টাকা বা তাদের পছন্দের খাবার—যাই হোক না কেন, আন্তরিকতা থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআন-হাদিসে বাবা-মাকে দান করার গুরুত্ব প্রচুরভাবে উল্লেখ আছে। আল্লাহ বলেন, “আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক দাও,” এবং বাবা-মা আত্মীয়দের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অবস্থান করেন। তাই সপ্তাহের বিশেষ দিন শুক্রবারে তাদের জন্য কিছু নিয়ে যাওয়া বা তাদের প্রয়োজনে ব্যয় করা আল্লাহর আদেশ পালনের একটি সুন্দর মাধ্যম। অনেক সময় বাবা-মা কোনো কিছু বলতে সংকোচবোধ করেন—সেক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজন নিজে থেকে বুঝে ব্যবস্থা করা সন্তানের দায়িত্ব।
উপহার দেওয়ার সময় সম্মান ও বিনয় বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মাকে কখনোই মনে করানো উচিত নয় যে তারা সন্তানের ওপর বোঝা। বরং উপহারটি দেওয়ার সময় হাসিমুখে বলা যেতে পারে—“এটা আপনার জন্য, আপনি খুশি হলে আমি খুশি হবো।” এতে তাদের মন খুশি হয় এবং দোয়া লাভ করা সহজ হয়। পাশাপাশি দান করার মাধ্যমে পরিবারের সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় হয় এবং আল্লাহর রহমতও বর্ষিত হয়।
সামগ্রিকভাবে, শুক্রবারে বাবা-মাকে দান বা উপহার দেওয়া শুধু একটি সওয়াবের কাজই নয়, বরং এটি একজন মুসলিম সন্তানের ভালোবাসা, সম্মান এবং কৃতজ্ঞতার সুন্দর প্রকাশ। এ আমল মানুষের চরিত্র উন্নত করে, পরিবারে শান্তি এনে দেয় এবং আল্লাহর নিকট দোয়া কবুলের দরজা খুলে দেয়।
6. বাবা-মায়ের জন্য শুক্রবারে বিশেষ দোয়া
শুক্রবারের দিন দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হওয়ার কারণে এই দিনে বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বরকতময় একটি আমল। ইসলামী শিক্ষায় উল্লেখ আছে যে বাবা-মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য যেমন রাহমাত, তেমনি সন্তানের দোয়া বাবা-মায়ের জন্যও অত্যন্ত মূল্যবান। শুক্রবারে জুম্মার নামাজের আগে ও পরে, খুতবার সময়, আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত—এই সময়গুলো বিশেষ দোয়ার সময় হিসেবে গণ্য হয়। এ সময় মন থেকে বাবা-মায়ের জন্য ক্ষমা, সুস্থতা, হেদায়েত, দীর্ঘায়ু এবং কল্যাণ কামনা করলে আল্লাহ বিশেষভাবে তা কবুল করেন।
দোয়া করার সময় নিচের দোয়াগুলো পাঠ করা যেতে পারে— “রব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সাগীরা।” অর্থ: হে আমার রব! আমার বাবা-মাকে দয়া করুন, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন। এছাড়াও বলা যেতে পারে— “আল্লাহুম্মাগফির লি ওয়া লিওয়ালিদাইয়া ওয়ারহামহুমা।” অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে, আমার বাবা-মাকে ক্ষমা করুন এবং তাদের প্রতি দয়া করুন।
যেসব বাবা-মা দুনিয়াতে নেই তাদের জন্যও দোয়া করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের কবর নূরে পূর্ণ হওয়া, শাস্তি থেকে মুক্তি এবং জান্নাতুল ফেরদৌস প্রাপ্তির জন্য নিয়মিত দোয়া করা সন্তানের দায়িত্ব। জীবিত বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে তাদের সুখ, শান্তি এবং দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের জন্য দোয়া করা আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয় একটি আমল। শুক্রবারে দোয়া করার মাধ্যমে সন্তানের প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় এবং পরিবারের মধ্যে বারাকাহ আসে।
7. যেসব ভুলগুলো এড়িয়ে চলা উচিত
শুক্রবারে বাবা-মায়ের সেবা, দান ও দোয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি হলেও কিছু ভুল রয়েছে যা এ দিন অবশ্যই এড়িয়ে চলা উচিত। প্রথমত, বাবা-মায়ের সঙ্গে রুক্ষ ভাষায় কথা বলা বা বিরক্তিভাব প্রকাশ করা। অনেক সময় ব্যস্ততা বা মানসিক চাপের কারণে সন্তানরা রাগ করে ফেলেন, যা ইসলামে নাজায়েজ এবং বড় গুনাহ। শুক্রবারের দিন বিশেষ করে বাবা-মায়ের সামনে মধুর ভাষায় কথা বলা উচিত।
দ্বিতীয়ত, শুধু শুক্রবারে নয়, বরং নিয়মিত বাবা-মায়ের অধিকার আদায় করা জরুরি। কিন্তু কেউ কেউ শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট দিনে ভালো ব্যবহার করে অন্যদিন অবহেলা করেন—এটি ভুল পদ্ধতি এবং আন্তরিকতার অভাবের পরিচয় বহন করে। বাবা-মায়ের সেবা প্রতিদিনের আমল হওয়া উচিত, আর শুক্রবার শুধু একটি অতিরিক্ত বরকতময় সুযোগ।
তৃতীয়ত, দান বা উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রদর্শন, অহংকার বা অন্যের সামনে দেখানো আচরণ এড়িয়ে চলা উচিত। বাবা-মাকে সাহায্য করা কখনোই লজ্জার বা গর্বের বিষয় নয়; বরং এটি ইবাদতের কাজ। তাই দান করার সময় বিনয় ও আন্তরিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থত, কারো বাবা-মা যদি অসুস্থ বা বয়স্ক হন, তবে তাদের কথা বা চলাফেরায় অধৈর্য হওয়া উচিত নয়। তাদের যত্ন নেওয়ার সময় তাড়াহুড়ো, বিরক্তি বা ক্লান্তির ভাব দেখানো ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
পরিশেষে, অনেকেই বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করা ভুলে যান বা গুরুত্ব দেন না। অথচ সন্তানের দোয়া বাবা-মায়ের জন্য বড় রহমত। তাই শুক্রবারে ব্যস্ততা যাই থাকুক না কেন, কিছু সময় বের করে বাবা-মায়ের জন্য আন্তরিক দোয়া করা অবশ্যই জরুরি।
এসব ভুল এড়িয়ে চললে শুক্রবারের সওয়াবপূর্ণ আমলগুলো আরও সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে পালন করা যায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সহজ হয়।
8. শুক্রবারে বাবা-মায়ের সেবা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
শুক্রবারের দিন বাবা-মায়ের সেবা করা ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। অনেকের মনে এই বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন থাকে—কিভাবে সেবা করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়, কোন কাজগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ন, কিংবা দূরে থাকলে কীভাবে সেবা করা যায়। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর তুলে ধরা হলো যাতে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।
প্রশ্ন ১: শুক্রবারে বাবা-মাকে কী ধরনের সেবা করা সর্বোত্তম?
উত্তর: সবচেয়ে উত্তম সেবা হলো—তাদের প্রয়োজন পূরণ করা, মানসিকভাবে খুশি রাখা, খাদ্য প্রস্তুতি বা ওষুধ আনা, ঘরের কাজ সহায়তা, অথবা তাদের সঙ্গে সময় কাটানো। হৃদয় থেকে করা প্রতিটি খিদমা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য।
প্রশ্ন ২: দূরে থাকলে কি শুক্রবারে বাবা-মায়ের সেবা করা যাবে?
উত্তর: অবশ্যই যাবে। ফোনে শুভেচ্ছা জানানো, খোঁজ নেওয়া, টাকা পাঠানো, প্রয়োজনীয় জিনিস অনলাইনে পাঠানো বা তাদের জন্য বিশেষ দোয়া করা—এসবও সেবা হিসেবে গণ্য হয় এবং পূর্ণ সওয়াব লাভ সম্ভব।
প্রশ্ন ৩: বাবা-মা অমুসলিম হলে কি শুক্রবারে তাদের সেবা করার সওয়াব আছে?
উত্তর: ইসলামে বাবা-মায়ের ধর্ম যাই হোক না কেন, তাদের সম্মান ও সেবা করা অপরিহার্য। তারা মুসলিম না হলেও সেবা করলে আল্লাহ প্রতিদান দেন—তবে ধর্মীয় বিষয়ে সহযোগিতা করা যাবে না।
প্রশ্ন ৪: বাবা-মায়ের সাথে Friday দিনে সময় না দিতে পারলে কি গুনাহ হবে?
উত্তর: সেবা করা একটি নৈতিক দায়িত্ব এবং সুন্নতসম্মত কাজ, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করলে গুনাহ হতে পারে। যে দিনই হোক, বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া কখনোই অনুমোদিত নয়।
প্রশ্ন ৫: নিজের পরিবার ও বাবা-মায়ের সেবা — কোনটি আগে?
উত্তর: ইসলামে উভয়ের অধিকার রয়েছে। তবে বাবা-মায়ের প্রয়োজন জরুরি হলে তাদের আগে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। পরিবারের দায়িত্বও পূরণ করতে হবে—উভয়ের প্রতি ভারসাম্য রাখা উত্তম।
এই প্রশ্নোত্তরগুলো শুক্রবারে বাবা-মায়ের সেবা সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে সাহায্য করবে এবং আমলগুলো আরও সহজ ও সওয়াবপূর্ণভাবে পালন করতে সহায়তা করবে।
9. উপসংহার
শুক্রবারের দিন বাবা-মায়ের সেবা, দান ও দোয়া করা ইসলামে অত্যন্ত মুবারক একটি কাজ। এ দিন এমনই বরকতময় যে প্রতিটি সৎকাজের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বাবা-মায়ের জন্য ছোট্ট একটি সাহায্যও আল্লাহর কাছে বড় ইবাদত হিসেবে গৃহীত হয়। তাদের হাসিমুখ দেখানো, দোয়া করা, প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করা বা শুধু পাশে বসে মধুর ভাষায় কথা বলা—এসবই মহান সওয়াবের কাজ।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেক সময় বাবা-মায়ের অধিকার ভুলে যাই। অথচ তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করার মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায়—এ কথা কুরআন ও হাদিসে বারবার উল্লেখ হয়েছে। বিশেষ করে শুক্রবারে এই সেবা আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে।
তাই প্রত্যেক সন্তানের উচিত—এই বরকতময় দিনে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে আন্তরিক চেষ্টা করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা। এতে শুধু দুনিয়ার শান্তি নয়, আখিরাতেও বিশাল প্রতিদান লাভ করা সম্ভব। এভাবেই শুক্রবারের দিনটি হয়ে উঠতে পারে ইবাদত, দোয়া ও পরিবারিক ভালোবাসায় ভরপুর একটি পবিত্র দিন।


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url